মায়ের দোয়ায় ভয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প।২৬ অক্টোবর ২০২৬
“আমার মা আমার জন্য দোয়া করে, যাতে আমার সংসারটা ভেঙে যায়।”
কথাটা নীলার মাথায় এসেছিল মায়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে। কাউকে বলা হয়নি। এমনকি রাশেদকেও না।
ছোটবেলায় নীলা দেখেছে, তার মা রহিমা বেগম পুরোনো শাড়ি যত্ন করে ভাঁজ করে আলমারিতে তুলে রাখতেন। নতুন শাড়ি কেনার কথা উঠলে বলতেন, “থাক, এই সংসারে এত শখ মানায় না।” অসুস্থ হলেও নিজের ওষুধের আগে ছেলেমেয়ের প্রয়োজন মেটাতেন। নীলা তখন মায়ের হাত ধরে বলত, “আমি বড় হয়ে তোমাকে অনেক সুখে রাখব।”
মা তাকে বুকে টেনে নিতেন।
বিয়ের পর নীলা সত্যিই মাকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিল। রাশেদ মায়ের পছন্দের একটা শাড়িও কিনে দিয়েছিল। বাড়ি ফিরে মা শাড়িটা আলমারিতে তুলে রেখেছিলেন।
“পরবে না?” নীলা জিজ্ঞেস করেছিল।
“বিশেষ দিনে পরব।”
সেই বিশেষ দিন আর আসেনি।
একদিন মায়ের বাড়িতে গিয়ে নীলা রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল। পাশের ঘরে শিউলি খালা বসে ছিলেন। দুজনের সামনে চায়ের কাপ, মাঝখানে একটা প্লেটে বিস্কুট।
শিউলি খালা বলছিলেন, “নীলার জামাই তো বেশ ভালো। মেয়েটাকে সুখে রেখেছে।”
রহিমা বেগম কাপটা নামিয়ে বললেন, “ভালো তো রাখবেই। মেয়ের ভাগ্য ভালো।”
“তাতে তোমার খুশি হওয়ার কথা।”
“খুশি হই না, তা বলিনি।”
মা জানালার দিকে তাকালেন। বাইরে শুকাতে দেওয়া কাপড়গুলো বাতাসে উড়ছিল।
“কিন্তু নিজের জীবনটার কথা মনে পড়ে যায়। এত বছর সংসার করলাম, কোনো দিন কেউ জিজ্ঞেস করল না আমার কী ভালো লাগে। একটা শাড়ি পছন্দ হলে দাম দেখে রেখে দিয়েছি। অসুখ হলে নিজেই ওষুধ কিনেছি। আর ওর মুখ একটু ভার হলেই জামাইয়ের কত চিন্তা!”
শিউলি খালা চুপ করে চা খাচ্ছিলেন।
মা আবার বললেন, “মেয়েটা ভালো থাকুক, আমিও চাই। কিন্তু সবকিছু এত সহজে পেয়ে গেলে সংসারের দাম বোঝে?”
নীলা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে মেয়ের জন্য কেনা ফ্রকের প্যাকেট। আঙুলের চাপে প্লাস্টিকটা মচমচ করে উঠল।
মা একটু থেমে বললেন, “মাঝে মাঝে মনে হয়, ওর জীবনেও একটু ঝড় আসুক। তখন বুঝবে, সব দিন এক রকম যায় না।”
কথাটা বলেই মা বিস্কুটের প্লেটটা শিউলি খালার দিকে এগিয়ে দিলেন।
“আরেকটা নাও।”
নীলা আর দাঁড়াতে পারল না। রান্নাঘরের কল খুলে হাত ধোয়ার ভান করল। পানির শব্দে নিজের শ্বাসের শব্দটাও চাপা পড়ে গেল।
এই সেই মা, যে ছোটবেলায় তার জ্বর হলে সারারাত মাথায় পানি দিতেন। যে মা নিজের ভাগের মাছটুকু মেয়ের পাতে তুলে দিয়ে বলতেন, তাঁর খেতে ইচ্ছে করছে না।
সেই মানুষটির ভালোবাসা কি মিথ্যা ছিল?
“কে রে?”
মায়ের ডাকে নীলা ঘরে ঢুকল।
“আমি, মা।”
মা তার হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে ফ্রক দেখলেন। তারপর বললেন, “বাচ্চাদের জিনিসেরও কত দাম! তোদের সময়টা ভালো।”
নীলা মৃদু হেসে বলল, “তোমার সময়টাও তো ভালো হতে পারত, মা।”
রহিমা বেগম মুখ তুলে তাকালেন। কথাটা তাঁর ভালো লাগল কি না, বোঝা গেল না।
কিছুক্ষণ পর তিনি নীলার জন্য চা বানালেন। নিজের কাপ থেকে একটা বিস্কুট ভেঙে অর্ধেক মেয়ের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
“নে, খা।”
নীলা বিস্কুটটা নিল। মায়ের চোখের নিচে কালি পড়েছে, হাতের আঙুলগুলোও আগের চেয়ে বাঁকা। হঠাৎ তার মনে হলো, এই মানুষটার জীবনে কত কিছুই হয়তো অপূর্ণ থেকে গেছে।
কিন্তু সেই অপূর্ণতার দায় কি তার?
বেরোনোর সময় মা ওড়নাটা ঠিক করে দিয়ে বললেন, “পৌঁছে ফোন করিস। আর শরীরের দিকে খেয়াল রাখিস।”
নীলা মাথা নাড়ল।
রাতে বাড়ি ফিরে মেয়েকে কোলে নিয়ে বসেছিল সে। রাশেদ পাশ থেকে বলল, “কী হয়েছে? আজ এত চুপচাপ কেন?”
“কিছু না।”
সে জানত, কথাটা বললে রাশেদ হয়তো অবাক হবে। কিন্তু মায়ের সম্পর্কে অভিযোগ করতে গিয়ে নিজেরই কেমন অপরাধী মনে হয়।
ঘুমানোর আগে ফোনটা বেজে উঠল।
মা।
“পৌঁছেছিস?”
“হ্যাঁ, মা।”
“নাতনি কী করছে?”
“ঘুমাচ্ছে।”
মা একটু থেমে বললেন, “আল্লাহ তোদের ভালো রাখুক।”
ফোন কেটে গেল।
নীলা ঘরে ফিরে দেখল, রাশেদ ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়েটাও ঘুমের মধ্যে মাকে খুঁজে হাত বাড়াল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।