মায়ের বাক্সের তালিকা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
মায়ের আত্মত্যাগের ছোটগল্প
১৯ অক্টোবর ২০২৬
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর রাফি প্রথম যে কথাটা বলেছিল, তা ছিল নতুন জুতা নিয়ে।
তার পুরোনো জুতার সামনের অংশে ফুটো হয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টি হলে মোজা ভিজে যেত, স্কুলের মাঠে হাঁটলে ধুলো ঢুকত ভেতরে। হাসপাতালে যাওয়ার আগেও সে মাকে জুতার কথা বলেছিল। মা তখন হেসে বলেছিলেন, মাসটা শেষ হোক, তারপর কিনে দেবেন।
অসুখের কারণে অনেক দিন স্কুলে যেতে পারেনি রাফি। বাড়ি ফেরার পর সে আবার পুরোনো জুতা পরেই স্কুলে যাওয়া শুরু করল।
এক সকালে জুতার ফাটা অংশটা আঙুল দিয়ে চেপে ধরে সে বলল,
— মা, এবার কিন্তু কালো জুতাটা কিনব। দোকানে একটা দেখেছি। খুব সুন্দর।
মা তার জুতার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— হ্যাঁ বাবা, কিনব। তুই আগে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে নে।
রাফি আর কথা বাড়াল না। মায়ের কথা সে বিশ্বাস করত। মা যখন বলতেন কিছু কিনে দেবেন, তখন দেরি হলেও একদিন না একদিন কিনে দিতেন।
বাড়িতে ফিরে আসার কয়েক দিন পর আলমারির নিচের তাকে রাখা মায়ের কাঠের বাক্সটা খুঁজতে গিয়ে সে একটা ছোট খাতা পেল। বাক্সে পুরোনো কাপড়, সুতো, কয়েকটা বোতাম আর কিছু কাগজ রাখা ছিল। খাতাটা ছিল সবার নিচে।
প্রথম পাতায় মায়ের হাতের লেখা—‘কেনাকাটার হিসাব’।
রাফি পাতাগুলো উল্টাতে লাগল। কোথাও বাজারের হিসাব, কোথাও চাল-ডালের দাম, কোথাও মাসের শেষে কত টাকা হাতে থাকবে তার হিসাব। শেষের দিকে একটা ছোট তালিকা।
১. কালো জুতা
২. নীল স্কুলব্যাগ
৩. শীতের সোয়েটার
৪. জ্যামিতি বাক্স
৫. নিজের জন্য একটা চশমা
৬. একটা শাড়ি
পাঁচ আর ছয় নম্বরের ওপর কালো কালি দিয়ে দাগ টানা। এতবার কাটা হয়েছে যে শব্দ দুটো প্রায় পড়াই যায় না।
রাফি খাতাটা কিছুক্ষণ হাতে ধরে রাখল। তারপর আগের জায়গায় রেখে বাক্সের ঢাকনা বন্ধ করে দিল।
মায়ের চশমার একটা ডান্ডা অনেক দিন ধরে ভাঙা। কালো টেপ পেঁচিয়ে তিনি সেটা জোড়া লাগিয়ে রেখেছেন। চশমাটা পরে সেলাই করতে বসলে তাঁকে কাপড়টা চোখের কাছে টেনে আনতে হয়। কখনো সুইয়ে সুতো পরাতে গিয়ে কয়েকবার চেষ্টা করতে হয়, কখনো সেলাইয়ের রেখা একটু এদিক-ওদিক হয়ে যায়।
রাফি ছোটবেলায় মায়ের পাশে বসে বোতাম লাগানো দেখত। মা তখন চশমাটা খুলে কপালে তুলে বলতেন,
— আলোটা একটু কাছে ধর তো, বাবা।
এখন রাফি বড় হয়েছে। মায়ের কাছে বসার সময় কমে গেছে। স্কুল থেকে ফিরে পড়তে বসে, বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়, কখনো ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তবু সেদিন খাতার পাতায় নিজের জন্য কেনার জিনিসগুলোর তালিকা দেখে তার মনে পড়ল, মা কত দিন ধরে ওই ভাঙা চশমাটা ব্যবহার করছেন।
পরদিন সকালে মা ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, চশমাটা টেবিলের ওপর রাখা। ভাঙা ডান্ডার কালো টেপ খুলে নতুন করে লাগানো হয়েছে। টেপের মাথাটা যত্ন করে ভাঁজ করা, যাতে আর খুলে না যায়।
পাশেই তাঁর পুরোনো শাড়িটা রাখা। ছেঁড়া পাড়ে নতুন সেলাই পড়েছে। সেলাইটা খুব সোজা হয়নি। কয়েক জায়গায় সুতো বাঁকা হয়ে গেছে, একটা ছোট গিঁটও বাইরে বেরিয়ে আছে।
মা চশমাটা হাতে নিয়ে দেখলেন। তারপর শাড়ির পাড়টা আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে রইলেন।
রাফি তখন স্কুলের জন্য তৈরি হচ্ছিল। সে পুরোনো জুতার ফিতা বাঁধতে বাঁধতে মাকে বলল,
— মা, আজ ফিরতে একটু দেরি হবে।
— কেন?
— স্কুলে কাজ আছে।
মা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। চশমাটা চোখে দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলেন।
রাফি দরজার বাইরে পা রাখতেই মা একবার ডাকতে গিয়েও ডাকলেন না। ছেলেটার জুতার সামনের ফুটোটা চোখে পড়েছিল তাঁর। তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চুলার আঁচ কমিয়ে দিলেন।
দুপুরে সেলাই করতে বসে মা চশমাটা পরে কাপড়ের ওপর সুতো চালালেন। জানালার পাশ দিয়ে আলো এসে পড়েছিল। সুইয়ে সুতো পরাতে আজও একটু সময় লাগল। সেলাইয়ের রেখাটাও দু-এক জায়গায় বাঁকা হলো।
মা চশমাটা খুললেন না।
কাপড়ের পাড়ে সুতো টেনে গিঁট দিলেন, তারপর পরের সেলাইটা শুরু করলেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।