মায়ের ভাগে শুধু পুরোনো ঘর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
পারিবারিক দ্বন্দ্বের ছোটগল্প
১৯ অক্টোবর ২০২৬
তিন ভাই বাবার সম্পত্তি ভাগ করে নিল। বড় ভাই রাশেদ পেল পাকা বাড়ি, মেজো ভাই কামাল সামনের জমি আর পুকুর, ছোট ছেলে সুমনের ভাগে পড়ল বাড়ির পেছনের এক টুকরো জমি। মায়ের থাকার জন্য রইল পুরোনো ঘরটা—যার টিনের ছাদে কয়েক জায়গায় ছিদ্র, আর বর্ষা নামলেই মেঝেতে পানি জমে।
ভাগাভাগির দিন মা উঠানের এক কোণে বসে ছিলেন। ছেলেরা কাগজপত্র নিয়ে কথা বলছিল। কোন জমির সীমানা কোথায়, কোন গাছের ফল কে পাবে, পুকুরের মাছ ধরার অধিকার কার—সবকিছুর হিসাব হচ্ছিল। মা একবার শুধু বলেছিলেন, তাঁর ঘরের চালটা মেরামত করা দরকার।
রাশেদ বলেছিল,
— পরে দেখা যাবে, মা।
তারপর আর কেউ কথাটা তোলেনি।
বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর মা নিজেই ব্যবস্থা করে নিলেন। বিছানার এক পাশে একটা বালতি, অন্য পাশে পুরোনো হাঁড়ি রাখলেন। ছাদের যে জায়গা দিয়ে বেশি পানি পড়ত, সেখানে বালতিটা সরিয়ে নিতেন। অন্য দিকের ফোঁটাগুলো জমত হাঁড়িতে। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে পাত্র দুটো উপচে পড়েছে কি না, দেখে আবার শুয়ে পড়তেন।
তিন ছেলে মাঝেমধ্যে মাকে দেখতে আসত। মা তাদের জন্য রান্না করতেন। রাশেদের পাতে একটু বেশি মাংস দিতেন, কামালের জন্য ডাল ঘন করে রান্না করতেন, আর সুমনের থালার পাশে রাখতেন কাঁচা মরিচ। ছেলেরা খেত, তারপর জমিজমার কথা বলতে বলতে চলে যেত।
কেউ মায়ের ঘরের ছাদের দিকে তাকাত না।
একদিন দুপুরে সুমন মায়ের ঘরে এসে দেখল, মা বিছানার চাদর রোদে শুকোতে দিয়েছেন। ঘরের ভেতরে ভেজা মাটির গন্ধ। বালতি আর হাঁড়িতে আগের রাতের বৃষ্টির পানি জমে আছে।
— মা, এভাবে আর কত দিন থাকবে? ঘরটা ঠিক করিয়ে দিই।
মা চাদরের কোণটা মেলে দিতে দিতে বললেন,
— তোদের যখন সময় হয়।
সুমন সেদিনই মিস্ত্রি নিয়ে আসার কথা দিল। ঘরের চাল মেরামত করতে হলে আগে বিছানা, কাঠের বাক্স আর পুরোনো জিনিসপত্র সরাতে হবে। সে বাক্সটা টেনে বের করল। তার পাশে রাখা কয়েকটা বাসন সরাতে গিয়ে চোখে পড়ল ছোট্ট একটা পিতলের পানদানি।
পানদানিটা তার বাবার ছিল।
বাবা খাওয়ার পর পান মুখে দিয়ে জানালার পাশে বসতেন। পানদানিটা বিছানার মাথার কাছে রাখতেন, আর মা রাতে ঘর গোছানোর সময় সেটি সরিয়ে দিতেন। বাবার মৃত্যুর পরও জিনিসটা ওই ঘরেই ছিল।
সুমন পানদানিটা হাতে তুলে দেখল। তলার দিকে একটা ফুটো। সে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল, তারপর পাশের বালতির পানিতে একটু ঢেলে পরীক্ষা করল। পানি ধরে রাখার ক্ষমতা নেই। তলা দিয়ে টুপটুপ করে পড়তে লাগল।
সে অবাক হয়ে পানদানিটার দিকে তাকিয়ে রইল। এতগুলো বাসনের মধ্যে মা এটাকে কেন রেখেছেন, সেটাই বুঝতে পারল না।
মা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সুমনের হাতে পানদানিটা দেখে বললেন,
— ওটা ওখানেই রাখিস।
— এটা তো ফুটো, মা। পানি রাখলে পড়ে যায়।
মা একটু এগিয়ে এসে পানদানিটা তার হাত থেকে নিলেন। তারপর বালতি আর হাঁড়ির মাঝখানে আগের জায়গায় রেখে দিলেন।
— ওটা সরাস না। ওটা তোর বাবার।
সুমন আর কিছু বলল না।
ঘরের চালের ওপর তখন মিস্ত্রিরা টিন মাপছিল। একজন নিচে নেমে এসে জানতে চাইল, বিছানাটা কোথায় রাখবে। সুমন মায়ের দিকে তাকাল। মা পানদানিটার পাশে জমে থাকা পানি কাপড় দিয়ে মুছছিলেন।
সুমন বালতি আর হাঁড়ি দুটো বাইরে নিয়ে রাখল। তারপর পানদানিটা দুই হাতে তুলে বিছানার মাথার কাছে, পুরোনো জায়গায় রেখে দিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।