শুধুই অপেক্ষা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। এপ্রিল ২২, ২০২৬
ঢাকার গরমটা তখন অসহ্যকর। সকাল থেকেই সূর্যটা এমনভাবে নেমে আসে, মনে হয় শহরের ওপর ঢাকনা দিয়ে চাপা দেওয়া হয়েছে। বাতাস আছে, কিন্তু সেটা কাজে লাগে না—শুধু গরমকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় টেনে নিয়ে যায়।
হাসপাতালের করিডোরে সেই তাপ আরও ঘন। দেয়ালের গায়ে হাত রাখলে যেন ভেতর থেকে উষ্ণতা ফিরিয়ে দেয়। বাতাসে পিচ গলা অ্যাম্বুলেন্সের গন্ধ। ফিনাইলের তীক্ষ্ণ ঝাঁঝ সেই গরমে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
এক প্রান্তে বিছানায় শুয়ে আছেন এক পিতা। বয়স খুব বেশি নয়, কিন্তু শরীরটা অনেক আগেই হাল ছেড়ে দিয়েছে। চোখ আধখোলা, মাঝে মাঝে শুধু শ্বাসের শব্দ শোনা যায়। পাশে রাখা ফাইল, রিপোর্ট, আর টাকার হিসাব লেখা কাগজ—সব মিলিয়ে যেন একটা অসমাপ্ত হিসাবের খাতা। এই হিসাবটা শেষ করার দায়িত্ব এসে পড়েছে তার মেয়ের ওপর।
মেয়েটার বয়স খুব বেশি না। ভার্সিটি থেকে সোজা এসেছে, এখনো গায়ের কামিজের বাম হাতায় নীল কালি শুকিয়ে আছে। হাতে ধরা কাগজে লেখা—“অপারেশনের জন্য জরুরি অর্থ প্রয়োজন।” সে এটা বারবার পড়ে না, কিন্তু একবার চোখে পড়লেই মনে হয় লেখাটা কাগজে নেই, তার বুকের ভেতরে ঢুকে গেছে।
ডাক্তার স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে—সময় খুব কম। তবু অপারেশন ছাড়া আর কোনো পথও নেই।
সে দিনের বেশিরভাগ সময় হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। গরমে তার চুল ঘেমে কপালে লেগে যায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কিন্তু সে জায়গা ছাড়ে না।
হাতে প্ল্যাকার্ড, চোখে অপেক্ষা।
মানুষ আসে, যায়। কেউ থেমে দেখে, কেউ দেখে না। কেউ আবার দেখেও চোখ ফিরিয়ে নেয় একটু তাড়াতাড়ি।
একদিন দুপুরে এক বিদেশি মানুষ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। তার হাঁটার গতি থেমে যায় প্ল্যাকার্ডের সামনে। সে পড়ে, তারপর মেয়েটার দিকে তাকায়। খুব বেশি কথা বলে না। শুধু একটা ছোট বাক্য, ভাঙা উচ্চারণে—
“My daughter too…”
তারপর পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে দেয়।
মেয়েটা কিছু বলে না। শুধু মাথা নোয়ায়।
লোকটা চলে যায়।
দিন গড়ায়। হিসাব বাড়ে। টাকার অঙ্ক বড় হয়, আর মেয়েটার দাঁড়িয়ে থাকা সময় আরও ভারী হয়ে ওঠে। অপেক্ষা তখন শুধু সময়ের বিষয় থাকে না—পায়ের নিচে জমে থাকা ঘামের মতো, চটচটে, সরতে চায় না।
এক বিকেলে সূর্যটা নিচু হয়ে আসে। তবু গরম কমে না। মেয়েটা আকাশের দিকে তাকায়। আকাশ পরিষ্কার, তবু অস্বস্তিকরভাবে নীরব।
তার চোখে পানি আসে—কান্না না।
সে চোখ মুছে না।
তার ভেতরে একটা অসমাপ্ত বাক্য ঘুরে ফিরে আসে—যেটা সে নিজেও ঠিকভাবে বলতে পারে না।
পরের দিন খবর আসে—অপারেশন করতে হবে দ্রুত।
কিন্তু টাকা এখনো জোগাড় হয়নি। কথাটা শোনার পর মেয়েটা প্রথমে নড়ে না। তারপর ধীরে ধীরে বোঝে—এটাই হয়তো শেষ সুযোগ।
সে বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
তারপর দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তার আঙুলে ঘাম জমে থাকে। প্ল্যাকার্ডটা এখনো হাতে।
সময় কেটে যায় ধীরে।
একসময় ডাক্তার এসে অপারেশনের তারিখ জানিয়ে যায়।
বাবার মুখে ক্লান্তি। চোখ স্থির।
“এখনও নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন।”
এই কথাটা শোনার পরও মেয়েটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ভেতরে ঢোকে।
ভিতরে পিতা শুয়ে আছেন। চোখ খোলে—খুব ধীরে। তার আঙুল একটু নড়ে। মেয়েটার ওড়নার কোণা ছুঁয়ে যায়।
মেয়েটা তাকিয়ে থাকে, তারপর মেঝেতে বসে পড়ে।
সে কাঁদে না,শুধু একটা দীর্ঘ শ্বাস বের হয়।
কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়ায়।
আরও একবার তাকায়।
তারপর প্ল্যাকার্ডটা হাতে নেয়।
এক মুহূর্ত।
ভাঁজ করে ব্যাগে রেখে দেয়।
গল্পটা এখানে শেষ হয় না—
শুধু থেমে থাকে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।