চিকিৎসা যখন বাজারে পরিণত হয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
প্রবন্ধ। এপ্রিল ২২, ২০২৬
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি বিস্তৃত হয়েছে এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিস্তার এখন দৃশ্যমান।
তবুও এই অগ্রগতির আড়ালে একটি কঠিন বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে—চিকিৎসা ব্যয় এতটাই বেড়ে গেছে যে তা সাধারণ মানুষের জন্য একটি সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৮.৫ শতাংশই রোগীর নিজ পকেট থেকে আসে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রায় ৫১ শতাংশ।
এর মানে হলো, বাংলাদেশি পরিবারগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ব্যক্তিগত আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করে। একটি সাধারণ অসুস্থতাও এখানে অনেক সময় একটি পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতি নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের অনুমান অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৪২ লাখ মানুষ শুধু চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। অর্থাৎ, চিকিৎসা এখানে শুধু রোগ সারায় না—অনেক মানুষের সামাজিক অবস্থানও পরিবর্তন করে দেয়, কিন্তু সেই পরিবর্তন প্রায়ই পতনের দিকে।
এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একাধিক আন্তঃসংযুক্ত কারণ।
সরকারি হাসপাতালগুলোর উপর অতিরিক্ত চাপ থাকলেও সেবা কাঠামো সীমিত। ফলে অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি খাতে যায়, যেখানে একই চিকিৎসার খরচ কয়েকগুণ বেশি। এখানে সিদ্ধান্ত আর চিকিৎসাগত থাকে না, বরং বাস্তবতার চাপ থেকে তৈরি হয় বাধ্যতা। চিকিৎসা তখন একটি মানবিক সেবা না থেকে অর্থনৈতিক চাপে পরিণত হয়।
রোগ নির্ণয়ের খরচও এই চাপকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একাধিক পরীক্ষা করানো হয়, কিন্তু এর পেছনের আর্থিক কাঠামো রোগীর কাছে অদৃশ্য থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি আল্ট্রাসনোগ্রামের জন্য রোগী ১২০০ টাকা পরিশোধ করে, যেখানে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক পান প্রায় ৩০০ টাকা। একইভাবে একটি CBC টেস্টে রোগী ৪০০ টাকা দেয়, যেখানে চিকিৎসক পান প্রায় ১৫০ টাকা। এই আর্থিক বলয় রোগীর সিদ্ধান্তের বাইরে থেকেই কাজ করে।
ওষুধের বাজারেও একই বাস্তবতা বিদ্যমান। একই জেনেরিক ওষুধ বিভিন্ন ব্র্যান্ডে ভিন্ন দামে বিক্রি হয়। ফলে রোগী কার্যকারিতার চেয়ে ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়। চিকিৎসার শেষ ধাপে এসে ওষুধের ব্যয় অনেক সময় পুরো চিকিৎসা খরচকে দ্বিগুণ করে তোলে।
এই পুরো কাঠামোতে দায় এককভাবে কারও নয়; বরং চিকিৎসক, ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠান এবং ওষুধ বিপণন—তিনটি স্তর একে অপরের সাথে যুক্ত এক অর্থনৈতিক প্রণোদনার চক্র তৈরি করেছে, যেখানে রোগী শেষ ব্যবহারকারী নয়, বরং মূল অর্থের উৎস।
এই কাঠামো ধীরে ধীরে চিকিৎসাকে মানবিক সেবা থেকে বাজারনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করছে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। একটি গুরুতর রোগ অনেক সময় একটি পরিবারের সঞ্চয় শেষ করে দেয়। কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ ঋণের চাপে পড়ে, আবার কেউ সন্তানের শিক্ষা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
চিকিৎসা এখানে শুধু আরোগ্যের মাধ্যম নয়, বরং দারিদ্র্য পুনরুৎপাদনের একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মানসিক প্রভাবও কম নয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসার ব্যয় বহন করার চাপ পরিবারে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি করে। অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা না নিয়ে রোগকে জটিল করে তোলে, যা শেষ পর্যন্ত আরও বেশি ব্যয় ও ঝুঁকি তৈরি করে।
ঢাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একটি আল্ট্রাসনোগ্রামের জন্য রোগী ১২০০ টাকা দেয়, যেখানে রিপোর্ট তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক পান মাত্র ৩০০ টাকা। এই হিসাব রোগীর কাছে কখনোই দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু তার জীবনযাত্রার সিদ্ধান্ত এই অদৃশ্য কাঠামোই নিয়ন্ত্রণ করে।
এই সংকটের সমাধান একমাত্রিক নয়, তবে কিছু নির্দিষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ জরুরি। প্রতিটি চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে কোন পরীক্ষা কেন প্রয়োজন, তা লিখিতভাবে উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা গেলে একটি কার্যকর জবাবদিহিতা কাঠামো তৈরি হবে। এতে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কমবে এবং রোগী শুধু ভোক্তা নয়, সিদ্ধান্তের অংশীদার হিসেবেও দাঁড়াবে।
একই সঙ্গে জেনেরিক নাম ব্যবহার করে ওষুধ প্রেসক্রাইব করার নিয়ম কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ব্র্যান্ডভিত্তিক মূল্যবৈষম্য হ্রাস পাবে এবং বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাস্থ্যসেবাকে শুধুমাত্র বাজারের নিয়মে চলতে দেওয়া যায় না। কারণ চিকিৎসা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি একটি মৌলিক মানবিক অধিকার। যখন এই অধিকার অর্থের সীমায় আটকে যায়, তখন উন্নয়ন সংখ্যায় বাড়লেও বাস্তবে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
শেষ পর্যন্ত, চিকিৎসা ব্যয় কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। একটি দেশের উন্নয়ন কতটা মানবিক, তা বোঝা যায় একজন সাধারণ মানুষ কতটা সহজে চিকিৎসা পেতে পারে তার ওপর।
পরিসংখ্যান এখানেই থেমে যায়।
কুড়িগ্রামের আমেনা বেগম এখনও তার ছেলের অপারেশনের রিপোর্ট হাতে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় বসে আছেন। টাকার অভাবে ভর্তি নিশ্চিত হয়নি। ছেলের বয়স নয় বছর। চারপাশে মানুষ আসছে-যাচ্ছে, কিন্তু তার অপেক্ষাটা কিসের জন্য—সেটা তিনি নিজেও ঠিক জানেন না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।