বিশ্বাস থেকে বাস্তব জীবনে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৮ অক্টোবর ২০২৬
ফজরের নামাজ পড়ে বাবা ঘরে ফিরলেন। ছেলে তখনো বিছানায় শুয়ে মুঠোফোন দেখছে। বাবা তাকে নামাজের গুরুত্ব বোঝালেন, সময়ের মূল্য নিয়ে কথা বললেন। অথচ কয়েক দিন ধরে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী বকেয়া বেতনের জন্য ঘুরছেন। বাবা প্রতিবারই বলছেন, ‘আগামী সপ্তাহে দিয়ে দেব।’
সেদিন দুপুরে বাবা আবার নামাজ পড়লেন। মোনাজাতে আল্লাহর কাছে রিজিকের বরকত চাইলেন। কিন্তু কর্মচারীর পাওনা মেটানোর কথা উঠতেই বললেন, ‘এখন হাতে টাকা নেই।’
এখানে প্রশ্ন নামাজ পড়া নিয়ে নয়, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা নিয়েও নয়। প্রশ্ন হলো, যে বিশ্বাস মানুষকে ন্যায়, দায়িত্ব ও সততার শিক্ষা দেয়, সেই বিশ্বাসের প্রভাব তার দৈনন্দিন আচরণে কতটা পড়ছে?
ইসলামে ইবাদত ও জীবনকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। নামাজ, রোজা, দোয়া কিংবা দান—এসবের পাশাপাশি মানুষের অধিকার রক্ষা, সৎ উপার্জন, জ্ঞান অর্জন এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকারও গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বাস শুধু মুখের ঘোষণা নয়; আচরণেও তার পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার কথা।
জ্ঞানের মর্যাদা, শেখার দায়
ইসলামের প্রথম ওহির সূচনা হয়েছিল ‘পড়ো’ নির্দেশ দিয়ে। পবিত্র কোরআনের সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াতে পড়া, সৃষ্টি এবং জ্ঞানের কথা এসেছে (সূরা আলাক, ৯৬:১–৫)। এই সূচনা জ্ঞানের গুরুত্ব সম্পর্কে গভীর তাৎপর্য বহন করে।
কিন্তু জ্ঞানের মর্যাদা স্বীকার করা আর জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করা এক বিষয় নয়। সন্তানকে ভালো মানুষ হওয়ার উপদেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু তার সামনে নিজে সেই আচরণের উদাহরণ তৈরি করা কঠিন। বাবা-মা যদি সারাক্ষণ মুঠোফোনে ব্যস্ত থাকেন, অথচ সন্তানকে পড়তে বলেন, তাহলে তাঁদের কথার সঙ্গে কাজের দূরত্ব শিশুটিও বুঝতে শেখে।
শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, জীবন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষকে নিজের কাজ, পেশা, পরিবার, সমাজ ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে হয়। অজ্ঞতাকে বিশ্বাসের বিকল্প বানালে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়ে।
পরিবর্তন শুরু হতে পারে একটি পরিবার থেকেই। রাত নয়টার পর পরিবারের সদস্যরা মুঠোফোন এক পাশে রেখে বিশ মিনিট বই পড়তে পারেন। বাবা-মা সন্তানকে পড়তে বলার পাশাপাশি নিজেরাও পড়বেন। কোনো বিষয়ে না জানলে তা স্বীকার করবেন, জানার চেষ্টা করবেন। এতে জ্ঞান শুধু উপদেশের বিষয় থাকবে না, অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠবে।
রিজিকের আশা, উপার্জনে সততা
ইসলামে রিজিকের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করতে বলা হয়েছে। কিন্তু সেই ভরসা কাজ ছেড়ে বসে থাকার অনুমতি নয়। সূরা আন-নাজমের ৩৯ নম্বর আয়াতে মানুষের প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে। আবার সূরা আল-জুমুআর ১০ নম্বর আয়াতে নামাজ শেষ হলে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানের নির্দেশ রয়েছে (সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩৯; সূরা আল-জুমুআ, ৬২:১০)।
অর্থাৎ প্রার্থনার পাশাপাশি বৈধ উপায়ে চেষ্টা করাও জীবনের অংশ। ব্যবসায় উন্নতি চাইলে পরিকল্পনা, দক্ষতা, পরিশ্রম ও বিচক্ষণতার প্রয়োজন। কৃষককে জমির পরিচর্যা করতে হয়, শিক্ষার্থীকে পড়তে হয়, ব্যবসায়ীকে বাজার বুঝতে হয়, কর্মজীবীকে নিজের কাজের দক্ষতা বাড়াতে হয়।
কিন্তু উপার্জনের প্রশ্নে শুধু সফল হওয়াই যথেষ্ট নয়; উপার্জনের পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে অন্যায়ভাবে একে অন্যের সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সূরা আল-মুতাফফিফিনের প্রথম তিন আয়াতে মাপে ও ওজনে কম দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা রয়েছে (সূরা আন-নিসা, ৪:২৯; সূরা আল-মুতাফফিফিন, ৮৩:১–৩)।
তাহলে যে ব্যবসায়ী নামাজ পড়েন, কিন্তু কর্মচারীর বেতন আটকে রাখেন, তাঁর ইবাদতের সঙ্গে আচরণের একটি গুরুতর অসংগতি তৈরি হয়। যে ব্যক্তি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দান করেন, অথচ পাওনাদারের ন্যায্য অধিকার এড়িয়ে যান, তাঁরও নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবা দরকার।
কর্মচারীর বেতন সময়মতো দেওয়া, ক্রেতাকে সঠিক তথ্য জানানো, পণ্যের মান নিয়ে প্রতারণা না করা এবং ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নেওয়া—এসবও নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বের অংশ। হাতে সত্যিই অর্থের সংকট থাকলে পাওনাদারকে এড়িয়ে না গিয়ে পরিস্থিতি জানানো এবং বাস্তবসম্মত পরিশোধের সময় নির্ধারণ করা উচিত।
আল্লাহর কাছে বরকত চাওয়ার সঙ্গে উপার্জন ও লেনদেনে সততা বজায় রাখার সম্পর্ক এখানেই।
ইবাদত, অথচ মানুষের অধিকার উপেক্ষা
ইসলামে আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের হক বা অধিকার রক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কখনো কখনো মানুষ ব্যক্তিগত ইবাদতকে এতটাই সামনে রাখেন যে তাঁর আচরণে অন্য মানুষ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তা আর বিবেচনায় আসে না।
একজন ব্যক্তি নিয়মিত নামাজ পড়েন, কিন্তু বাড়িতে স্ত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। কেউ ধর্মীয় আলোচনায় অংশ নেন, অথচ দুর্বল আত্মীয়ের প্রাপ্য সম্পদ আটকে রাখেন। কেউ অন্যায় দেখেও নীরব থাকেন, কারণ প্রতিবাদ করলে নিজের সুবিধা নষ্ট হতে পারে।
ইবাদত মানুষের মধ্যে তাকওয়া—আল্লাহসচেতনতা—গড়ে তোলার কথা। সূরা আল-আনকাবুতের ৪৫ নম্বর আয়াতে নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে বলে উল্লেখ করা হয়েছে (সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৪৫)। এর অর্থ এই নয় যে নামাজ পড়া মানুষ কখনো ভুল করবেন না। মানুষ ভুল করতে পারেন, দুর্বলতার কাছে হার মানতে পারেন। কিন্তু ভুল বুঝতে পারলে তা সংশোধনের চেষ্টা করাও জরুরি।
কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে তাঁকে শুধু ধৈর্য ধরতে বলা যথেষ্ট নয়; তাঁর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে কারও প্রতি অন্যায় হলে সুবিধাবাদী নীরবতার বদলে ন্যায্য অবস্থান নেওয়া দরকার। আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার অর্থ এই নয় যে তাঁর অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে হবে।
ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মর্যাদা বাড়াতে পারে তখনই, যখন সেই পরিচয়ের সঙ্গে ন্যায়বোধ ও দায়িত্ববোধও প্রকাশ পায়।
প্রকৃতির প্রতিও দায়িত্ব
পৃথিবী ও তার সম্পদ মানুষের জন্য আল্লাহর দান। কিন্তু দান মানে ইচ্ছেমতো অপচয় বা ধ্বংস করার অধিকার নয়। সূরা আল-আ'রাফের ৫৬ নম্বর আয়াতে পৃথিবীতে সংশোধনের পর বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হয়েছে। সূরা আর-রহমানের ৭–৯ নম্বর আয়াতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং তা নষ্ট না করার কথা এসেছে (সূরা আল-আ'রাফ, ৭:৫৬; সূরা আর-রহমান, ৫৫:৭–৯)।
নদীতে বর্জ্য ফেলা, জলাশয় ভরাট করা, গাছ কেটে পরিবেশের ক্ষতি করা কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ অপচয় করা—এসবের প্রভাব শুধু প্রকৃতির ওপর পড়ে না; মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপরও পড়ে।
পরিবেশ রক্ষা তাই কেবল সামাজিক সচেতনতার বিষয় নয়, দায়িত্বশীলতারও বিষয়। নিজের বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পানি অপচয় না করা এবং নদীদূষণ দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো—এসব কাজের বাস্তব গুরুত্ব আছে। একই সঙ্গে শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশবিষয়ক আইন কার্যকর করার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব পালন করতে হবে।
প্রার্থনার পরের কাজ
আবার সেই বাবার কথায় ফিরে আসা যাক। তিনি নামাজ পড়েন, আল্লাহর কাছে রিজিকের বরকত চান। এখন যদি তিনি কর্মচারীর বকেয়া বেতনের হিসাব করেন, টাকা দেওয়ার নির্দিষ্ট দিন ঠিক করেন এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সেই দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তাঁর প্রার্থনার সঙ্গে কাজের একটি যোগ তৈরি হবে।
ছেলেকে নামাজের কথা বলার পাশাপাশি তিনি নিজে সময়ের মূল্য দিতে পারেন। সন্তানকে সততার শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায় সততা দেখাতে পারেন। পরিবারের সদস্যদের অধিকার রক্ষা করতে পারেন, অন্যায়ের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন।
ইসলামে দোয়া ও চেষ্টা একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়। ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি অন্যায়ের ক্ষতি পূরণ করার চেষ্টা, রিজিকের প্রার্থনার পাশাপাশি বৈধ উপার্জন এবং ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের হক আদায়—এসবই বিশ্বাসকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে।
নিজের আচরণ পর্যালোচনা করা, ভুল স্বীকার করা এবং সংশোধনের চেষ্টা করাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
দিন শেষে প্রশ্নটি শুধু এই নয়—আমরা কতবার আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি। প্রশ্ন হলো, সেই বিশ্বাস আমাদের কাজে কতটা সততা এনেছে, অন্যের অধিকার রক্ষায় কতটা দায়িত্বশীল করেছে, আর অন্যায় থেকে সরে আসতে কতটা সাহস জুগিয়েছে।
বিশ্বাসের পরিচয় শুধু ইবাদতে নয়; ইবাদতের শিক্ষা জীবনে কতটা ধারণ করতে পেরেছি, তার মধ্যেও।
তথ্যসূত্রঃ-
১. পবিত্র কোরআন, সূরা আলাক, আয়াত ১–৫। পড়া, জ্ঞান ও শিক্ষার গুরুত্ব।
২. পবিত্র কোরআন, সূরা আন-নাজম, আয়াত ৩৯। মানুষের প্রচেষ্টার গুরুত্ব।
৩. পবিত্র কোরআন, সূরা আল-জুমুআ, আয়াত ১০। নামাজের পর জীবিকা অনুসন্ধানের নির্দেশ।
৪. পবিত্র কোরআন, সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৯। অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগের নিষেধাজ্ঞা।
৫. পবিত্র কোরআন, সূরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত ১–৩। মাপে ও ওজনে কম দেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্কতা।
৬. পবিত্র কোরআন, সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত ৪৫। নামাজ ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার সম্পর্ক।
৭. পবিত্র কোরআন, সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত ৫৬। পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি না করার নির্দেশ।
৮. পবিত্র কোরআন, সূরা আর-রহমান, আয়াত ৭–৯। ভারসাম্য ও ন্যায় রক্ষার নির্দেশ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।