অতীতের ওপারে
অধ্যায় দুই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১৬, জুন ২০২৬
—তুমি কী বলতে চাচ্ছো?
মা আসাবে বিস্মিত চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন।
রাশিদা উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি আবার বললেন,
—তুমি তাকে চিনলে কীভাবে?
—আমি তাকে খুব একটা চিনি না,—রাশিদা ধীরে বলল,—তবে এটুকু জানি, সে এমন একজন মানুষ যার একটা অতীত আছে, আর...
—অতীত আছে?
মা আসাবে তার কথা কেটে দিলেন।
—সবারই তো একটা অতীত থাকে। তাহলে কি তুমি তার অতীতের জন্য তাকে বিচার করছো?
—মা...
—আর তুমি জানলে কীভাবে যে তার অতীত আছে?
—যদি সে তাওবা করে থাকে? যদি সে বদলে গিয়ে থাকে? যদি আল্লাহ তাকে সঠিক পথ দেখিয়ে থাকেন, যেমন তোমাকে দেখিয়েছেন?
—তাহলে শুধু তার অতীত আছে বলেই তুমি তাকে বিয়ে করতে চাইছো না? সেই কারণেই কি তুমি তোমার কাভুর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছো?
—এটাই কারণ?
—মা, আমাকে একটু বলতে দিন।
অবশেষে মা আসাবে চুপ করলেন।
রাশিদা চোখের পানি মুছে গভীর শ্বাস নিল।
—কারণটা তার অতীত নয়। আমি জানি না তার কোনো অতীত আছে কি না।
—তাহলে সমস্যা কোথায়?
—আমি এমন মানুষ নই যে কারও অতীত দেখে তাকে বিচার করি। আমরা সবার জীবনেই কিছু না কিছু থাকে। পার্থক্য শুধু এই যে, আমরা সবসময় অন্যেরটা দেখতে পাই।
—আমি তাকে চিনি, মা।
—কীভাবে?
রাশিদা চোখ নামিয়ে ফেলল।
—আগে একবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
—দেখা হয়েছিল?
—না, কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু আমি তাকে চিনি… তার ব্যবহার দেখে মানুষটা কেমন, সে সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়েছি।
—কী হয়েছিল?
রাশিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—কয়েক সপ্তাহ আগে সে আমার কাছে এসেছিল।
ঘরটা কয়েক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
—সে কোনো সম্মানজনক উদ্দেশ্যে আসেনি।
—সে চেয়েছিল আমার সঙ্গে একটা অবৈধ সম্পর্ক রাখতে।
মা আসাবে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
—আর আমি না বলেছিলাম।
এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
—কারণ আমি আর সেই মানুষটা নই।
—সে আবার এসেছিল।
—আর প্রথমবারের মতো এবারও আমি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।
—মা, জানেন সেটা কত কষ্টের ছিল?
—মানুষ এখনও আমাকে সেই কিশোরী মেয়েটা হিসেবেই দেখে, যে বিয়ের আগে সন্তান জন্ম দিয়েছিল। তারা আমাকে দেখে না, আমি কেমন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছি।
এবার তার চোখের পানি আর থামল না।
—আমি অপমানিত বোধ করেছিলাম।
—কেন?
—খাদিজার জন্মের পর আমি আর কখনো সেই পথে ফিরিনি। নিজের জীবন বদলেছি। তবু কিছু মানুষ এখনও আমাকে সহজ শিকার মনে করে।
—যেন যে কেউ এসে এমন প্রস্তাব দিতে পারে।
—আমি বিশ্বাস করিনি, মা। একদমই না।
—কেন করিসনি?
—কারণ যদি তার উদ্দেশ্য ভালো হতো, তাহলে সে আগে ওইভাবে আমার কাছে আসত না।
—তার শুধু একটা অতীত নেই। সে এখনও দুনিয়ার মোহে আটকে আছে।
মা আসাবে চুপ করে রইলেন।
রাশিদা এগিয়ে এসে মায়ের হাত ধরল।
—মা, আমাকে বোঝার চেষ্টা করুন। সে শুধু আমাকে আরেকবার ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
মা আসাবে তার হাত শক্ত করে ধরলেন।
—যদি তার উদ্দেশ্য সত্যিই সৎ না হয়, তাহলে এই বিয়ে টিকবে না।
—এইবারও আমি তোমার কাভুর পক্ষ নেব না।
—ধন্যবাদ, মা।
—এখনই ধন্যবাদ দিও না।
—এখন আমাদের ভাবতে হবে তোমার কাভুকে কীভাবে বোঝানো যায়। সে তো আগেই বিশ্বাস করে তুমি ইচ্ছা করে সব পাত্রকে ফিরিয়ে দাও।
—কাভুকে নিয়ে চিন্তা করবেন না।
—মা... আমরা কি এই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারি?
—কী বলছো?
—আমি ক্লান্ত।
সে মুখ ঢেকে ফেলল দুই হাতে।
—সবকিছুতে ক্লান্ত। এই পরিবেশ, এই মানুষগুলো, এমনকি এই বাড়িটাও।
মা আসাবে চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন।
—মানুষের ফিসফাস শুনতে শুনতে ক্লান্ত। বিচার হতে হতে ক্লান্ত। সবাই বলে আল্লাহ ক্ষমা করেন, কিন্তু মানুষ করে না।
—তারা বারবার আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমি আগে কে ছিলাম। অথচ আমি নিজেই তো সেটা ভুলিনি।
—তাহলে তুমি চাও আমরা অন্য কোথাও যাই?
—জ্বি, মা।
—নিশ্চিত?
—একদম।
—খাদিজার কী হবে?
—সে সবসময় আমার মেয়ে থাকবে। এই সত্য আমি কখনো লুকাব না।
মা আসাবে ধীরে বললেন,
—তুমি দেশ বদলালেও গল্পটা বদলাবে না।
রাশিদা মাথা নাড়ল
—জানি। কিন্তু অন্তত মানুষ আমার মুখ থেকে সত্যিটা শুনবে।
সে থেমে গেল।
—আর একটা কথা... খাদিজা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত।
মা আসাবে তাকালেন।
—আমি তো ভাবতাম তুমি তাকে পছন্দ করো না।
—আমি আমার মেয়েকে ভালোবাসি।
—হ্যাঁ, আমি ভুল করেছি। কিন্তু সে আমাকে বদলে দিয়েছে।
—তার কারণেই আমি আজকের আমি। কুরআনের হাফিজা হয়েছি, দ্বীনের পথ চিনেছি।
সে মায়ের দিকে তাকাল।
—এটার চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে?
—যদি সে তোমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস হয়... তাহলে তুমি কি ভেবেছো, তার কাছে তুমি কী?
রাশিদার হাসি মিলিয়ে গেল।
—সে যখন বড় হবে, সব বুঝবে...
—বলো তো রাশিদা... ঠিক কীভাবে তুমি এটা করতে চাও?
রাশিদা থেমে গেল।
চোখ স্থির।
শ্বাস ভারী।
তারপর—
—আমি তাকে চিনি, মা। আর তাই তাকে বিয়ে করতে পারব না।
----------------------সমাপ্ত-----------------------
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।