স্ক্রিনের ওপারে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৯ জুলাই, ২০২৬
স্ক্রিন শুধু বিনোদন দেয় না, অজান্তেই অনেক মূল্যবোধও শিখিয়ে দেয়।
অভিক প্রথমে বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি।
তার নয় বছরের ছেলে অয়ন স্কুল থেকে ফিরেই মোবাইল হাতে নিত। কার্টুন দেখত, ভিডিও দেখত, কখনো গেম খেলত। অভিক ভাবত, এ যুগের বাচ্চারা এমনই করে। এতে আর সমস্যা কী?
একদিন রাতের খাবার খেতে বসে অয়ন হঠাৎ বলল,
"বাবা, যার অনেক ফলোয়ার, সে-ই সবচেয়ে বড় মানুষ, তাই না?"
অভিক চামচ থামিয়ে ছেলের দিকে তাকাল।
"কে বলেছে তোমাকে?"
"সবাই তো তাই বলে। ভিডিওতেও দেখলাম।"
অভিক হেসে বিষয়টা উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু পারল না।
কয়েকদিন পর আরেকটা ঘটনা ঘটল। অয়ন তার মায়ের ওপর রাগ করে বলল,
"তোমার ফোনটা ভালো না। সবার নতুন ফোন আছে।"
এই কথাগুলো যেন তার নিজের নয়। কোথাও থেকে শেখা, কোথাও থেকে ধার করা।
সেদিন রাতে অভিক ছেলের পাশে এসে বসল। বলল,
"সারাদিন কী কী দেখো, আমাকে একটু দেখাবে?"
অয়ন খুব আগ্রহ নিয়ে একের পর এক ভিডিও চালাতে লাগল। কেউ দামি গাড়ি দেখিয়ে বড়লোকি দেখাচ্ছে, কেউ অদ্ভুত কাণ্ড করে হাসাচ্ছে, কেউ আবার অন্যকে অপমান করে জনপ্রিয় হচ্ছে।
অভিক বুঝতে পারল, ছেলেটা শুধু ভিডিও দেখছে না, অজান্তে মানুষ, সাফল্য আর জীবন নিয়ে একটা ভুল ছবি এঁকে নিচ্ছে।
পরদিন বিকেলে সে অয়নকে নিয়ে পার্কে গেল। মোবাইল সঙ্গে ছিল, কিন্তু পকেটেই পড়ে রইল।
অনেকদিন পর বাবা-ছেলে একসঙ্গে ক্রিকেট খেলল। তারপর ঘাসের ওপর বসে আইসক্রিম খেল।
ফেরার পথে অয়ন বলল, "বাবা, আজ ভিডিও দেখিনি, তবুও অনেক মজা হয়েছে।"
অভিক হেসে বলল, "সব আনন্দ স্ক্রিনের ভেতরে থাকে না।"
এরপর থেকে বাসায় কয়েকটা ছোট নিয়ম হলো।
রাতে খাওয়ার সময় কারও হাতে ফোন থাকবে না। ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে সব স্ক্রিন বন্ধ। আর অয়ন কী দেখছে, তা নিয়ে বকাঝকা নয়, আলোচনা হবে। অভিক আর তার স্ত্রী ঠিক করল, তারাও ছেলের সামনে অকারণে ফোন ঘাঁটবে না। কারণ শিশুরা নিষেধের চেয়ে অনুকরণ বেশি শেখে।
তারা একসঙ্গে ঠিক করল, অয়ন দিনে কতক্ষণ স্ক্রিন দেখবে এবং কী ধরনের ভিডিও দেখবে, সেটা দুজনে মিলে বাছাই করবে। ইউটিউবে কিডস প্রোফাইল চালু করা হলো, অপ্রয়োজনীয় চ্যানেলগুলো সরিয়ে শিক্ষামূলক আর সৃজনশীল চ্যানেল রাখা হলো।
কিছুদিন পর অয়ন নিজেই একটা ভিডিও দেখিয়ে বলল, "বাবা, এটা কি সত্যি, না বানানো?"
অভিকের ভালো লাগল। সে বুঝল, নিষেধ করতে শেখার চেয়ে প্রশ্ন করতে শেখাটা অনেক বেশি জরুরি।
আজকের শিশুরা শুধু পরিবার বা স্কুল থেকে শেখে না। তারা প্রতিদিন অসংখ্য পর্দা থেকে শেখে—কী সুন্দর, কী জনপ্রিয়, কী সফল, এমনকি কীভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়।
তাই শুধু "মোবাইল নামিয়ে রাখো" বললেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
বরং তাদের পাশে বসে জানতে হয়, তারা কী দেখছে, কেন দেখছে, আর সেই দেখার ভেতর থেকে কী শিখছে। তাদের হাতে বিকল্প আনন্দ তুলে দিতে হয়—খেলা, গল্প, বই, পরিবারের সঙ্গে সময়।
কারণ একটা স্ক্রিন শুধু সময় কেড়ে নেয় না। নীরবে একটা শিশুর চিন্তা, অভ্যাস আর মূল্যবোধও গড়ে দেয়।
আর সেই কারণেই, শিশুদের হাতে মোবাইল দেওয়ার আগে তাদের পাশে একজন মানুষ থাকা আরও বেশি জরুরি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।