শিক্ষা কি শ্রেণীভেদ তৈরি করে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, প্রাবন্ধিক
প্রবন্ধ। এপ্রিল ১১, ২০২৬
শরৎচন্দ্রের কুবের (পল্লীসমাজ) আর শিক্ষিত সমাজ—এই দূরত্ব কেন এত স্পষ্ট?
শিক্ষা সাধারণত আলো হিসেবে দেখা হয়—অন্ধকার দূর করার মাধ্যম। কিন্তু বাংলা সাহিত্য যখন এই আলোর দিকে তাকায়, তখন সেখানে আরেকটা অস্বস্তিকর সত্য ধরা পড়ে: এই আলো সব জায়গায় সমানভাবে পড়ে না। কোথাও এটি পথ দেখায়, আবার কোথাও এটি দূরত্ব তৈরি করে।
বাংলা সাহিত্যে শিক্ষা প্রায়ই কেবল জ্ঞান অর্জনের বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি; বরং এটি সামাজিক অবস্থানের একটি চিহ্ন হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত হওয়া মানে শুধু চিন্তার উন্নতি নয়, বরং এক ধরনের ভিন্ন সামাজিক স্তরে প্রবেশ করা। এই ভিন্নতা অনেক সময় সমাজের ভেতরে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে, যেখানে একই সমাজের মানুষও একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পল্লীসমাজ ও শ্রীকান্ত–এর মতো রচনায় এই বিভাজন স্পষ্টভাবে দেখা যায়। কুবের (পল্লীসমাজ)-এর মতো চরিত্ররা শ্রম, দারিদ্র্য এবং গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতার ভেতরে দাঁড়িয়ে জীবনকে বোঝে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। অন্যদিকে শিক্ষিত চরিত্ররা সেই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে দূর থেকে। এই দূরত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি ভাষা, চিন্তা এবং মূল্যবোধেরও দূরত্ব। ফলে একই সমাজের ভেতরে থেকেও দুই ধরনের বাস্তবতা তৈরি হয়, যা প্রায় কখনোই এক বিন্দুতে মিলিত হয় না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা উপন্যাসেও এই বিভাজনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এখানে শিক্ষা, পরিচয় এবং সামাজিক অবস্থান একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে জড়িয়ে আছে। শিক্ষিত সমাজ যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় এগিয়ে থাকলেও, সেই জ্ঞান অনেক সময় বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংঘর্ষে আসে। ফলে শিক্ষা শুধু উন্নতি নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক দূরত্বের ভাষাও তৈরি করে।
ড্যানিয়েল কাহনেমানের চিন্তাধারাও এখানে বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করে। তিনি দেখান, মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুই ধরনের ব্যবস্থা কাজ করে—দ্রুত ব্যবস্থা (অন্তর্দৃষ্টি ও আবেগনির্ভর) এবং ধীর ব্যবস্থা (যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ)। শিক্ষিত সমাজ অনেক সময় ধীর ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে যুক্তি তৈরি করে, কিন্তু শ্রমজীবী বা প্রান্তিক বাস্তবতায় দ্রুত, অভিজ্ঞতানির্ভর সিদ্ধান্ত বেশি প্রাধান্য পায়। এই দুই ধরনের চিন্তাপদ্ধতির পার্থক্যও এক ধরনের সামাজিক দূরত্ব তৈরি করে, যা সাহিত্যে শ্রেণীভেদের রূপ নেয়।
শিক্ষা একদিকে সামাজিক গতিশীলতা তৈরি করে—মানুষকে নিজের অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ দেয়। কিন্তু অন্যদিকে এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোও তৈরি করে, যেখানে সবাই সমানভাবে শুরু করলেও সমানভাবে এগোতে পারে না। কারণ সম্পদ, পরিবেশ এবং সামাজিক পুঁজির ভিন্নতা শিক্ষার ফলাফলকে প্রভাবিত করে। ফলে শিক্ষা সমতা আনার পাশাপাশি বৈষম্যকেও পুনরুৎপাদন করে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শিক্ষা নিজে শ্রেণীভেদ তৈরি করে না, বরং এটি যে সামাজিক কাঠামোর ভেতরে কাজ করে, সেই কাঠামোই শ্রেণীভেদকে টিকিয়ে রাখে। এই কাঠামোর কারণে শিক্ষা অনেক সময় মুক্তির হাতিয়ার হলেও, একই সঙ্গে এটি সামাজিক বিভাজনের সূক্ষ্ম রূপও তৈরি করে।
বাংলা সাহিত্যে এই বাস্তবতা বারবার ফিরে আসে। কুবেরের মতো চরিত্ররা যেখানে জীবনের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে শিক্ষিত চরিত্ররা অনেক সময় সেই বাস্তবতাকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়, সেটাই শ্রেণীভেদের নতুন রূপ—যেখানে মানুষ একই সমাজে থেকেও ভিন্ন জগতে বাস করে।
তবে শিক্ষা কেবল বিভাজনের মাধ্যম নয়। এটি সচেতনতা তৈরি করে, সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখায় এবং অদৃশ্য বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করে তোলে। কুবেরের মতো চরিত্রদের উপস্থিতি সাহিত্যে দেখায় যে সমাজ শুধু একরকম নয়, বরং বহুস্তরীয় এবং জটিল।
বেগম রোকেয়ার লেখায়ও এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। তিনি দেখান, শিক্ষাহীন নারী শুধু পুরুষের অধীন নয়, শিক্ষিত নারীরও অধীন হয়ে পড়ে—ফলে শিক্ষা অনেক সময় নতুন ধরনের শ্রেণী কাঠামো তৈরি করে। এই জায়গায় শিক্ষা মুক্তির পাশাপাশি নতুন অসমতার বাস্তবতাও তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আরও গভীর হয়ে দাঁড়ায়—শিক্ষা কি সত্যিই শ্রেণীভেদ তৈরি করে, নাকি এটি শুধু সমাজে বিদ্যমান শ্রেণীভেদকে আরও স্পষ্ট এবং দৃশ্যমান করে তোলে?
তথ্যসূত্র
১. শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় — পল্লীসমাজ, শ্রীকান্ত
২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর — গোরা
৩. ড্যানিয়েল কাহনেমান — দ্রুত ও ধীর চিন্তা
৪. বেগম রোকেয়া — সুলতানার স্বপ্ন, নারীর অধিকার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।