সিরিজের নামঃ- নিজের জীবনটাও ছিল
গল্প ৪-একটা জীবন ধার করে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১০ আগষ্ট, ২০২৬
অভিক ভেবেছিল, সংসারের জন্য নিজের জীবনটা কিছুদিনের জন্য ধার দিচ্ছে। কয়েকটা বছর মাত্র। মেঘ একটু বড় হবে, মিশির পড়াশোনা শেষ হবে, বাড়ির ঋণটা মিটে যাবে—তারপর আবার নিজের মতো করে বাঁচবে। কিন্তু সে তখন জানত না, ধার দেওয়া জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একসময় সেটা ফেরত নেওয়ার সময়টাই আর হাতে থাকে না।
অভিকের জীবন খুব সাধারণ ছিল। চাকরি, সংসার, বাজার, বিল, মেঘের স্কুল, মিশির টিউশন—সব মিলিয়ে দিনের পর দিন একই ছকে কেটে যেত। বিয়ের কয়েক বছর পর এক রাতে নিশি বলেছিল, “একদিন আমরা শুধু নিজেদের জন্যও কিছু করব, তাই না?” অভিক হেসে বলেছিল, “অবশ্যই। ওরা একটু বড় হোক, তারপর।”
“ওরা একটু বড় হোক”—কথাটা অজান্তেই তার জীবনের নিয়ম হয়ে গেল।
মেঘ ছোট, তাকে সময় দিতে হবে। মিশির শরীর খারাপ, ডাক্তার দেখাতে হবে। বাড়ির কিস্তি বাকি, সেটা আগে মেটাতে হবে। বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ এসেছে, সেটাও তো জরুরি। প্রতিটা কারণই সত্যি ছিল, প্রতিটা সিদ্ধান্তের পেছনেই ছিল ভালোবাসা। তাই অভিকের নিজের কাছে নিজের জীবনটাকে পিছিয়ে দেওয়াটা কোনো ত্যাগ বলেও মনে হয়নি। সে শুধু বলত, “এখন না, আর একটু পরে।”
আলমারির মাথায় গিটারটা পড়ে থাকত। অনেক বছর আগে নিজের প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে কিনেছিল। একসময় সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে বাজাত। পরে সময় কমে গেল। গিটারটা ধুলোয় ঢেকে গেল। পাহাড়ে যাওয়ার একটা পুরোনো স্বপ্ন ছিল তার। ডায়েরির এক পাতায় কয়েকটা জায়গার নামও লিখে রেখেছিল। নিশি মাঝে মাঝে বলত, “চলো না, দুদিনের জন্য কোথাও ঘুরে আসি।” অভিক হাসত, “এখন অনেক খরচ। ওরা একটু বড় হোক, তারপর যাব।”
তারপর বছর কেটে গেল।
মেঘ কলেজে উঠল। খরচ বাড়ল। মিশি নাচ শিখতে চাইল, নতুন করে ভর্তি করাতে হলো। অভিক আবার হিসাবের খাতা খুলল। কোথায় কত খরচ কমানো যায়, সেটা ভাবতে ভাবতেই নিজের জন্য রাখা সামান্য টাকাটাও সরিয়ে দিল।
একদিন সন্ধ্যায় নিশি খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আমরা কি কখনো শুধু দুজন কোথাও গেছি?”
অভিক উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল।
মনে করার চেষ্টা করল।
বিয়ের পর প্রথম দিকে একবার গিয়েছিল। তারপর মেঘ এসেছে। মিশি এসেছে। তারপর সংসার।
সে হঠাৎ বুঝল, “পরে” কথাটার ওপর ভর করে সে কতগুলো বছর পার করে দিয়েছে।
মেঘ চাকরি পেল। মিশিও বড় হলো। একসময় বাড়িটা অদ্ভুত শান্ত হয়ে গেল। যে ঘরে একসময় মেয়েদের দৌড়ঝাঁপ আর হাসির শব্দ থাকত, সেখানে এখন সন্ধ্যার পর টিভির শব্দটুকুই শোনা যায়।
এক বিকেলে অভিক বারান্দায় বসে ছিল। নিশি এসে পাশে বসল।
“এখন তো ওরা বড় হয়েছে,” নিশি বলল, “এবার কি আমরা নিজেদের জন্য একটু বাঁচব?”
অভিক হেসে তার দিকে তাকাতে গিয়ে থেমে গেল। হাঁটুর ব্যথাটা সেদিন বেশি ছিল। চোখে আগের মতো পরিষ্কার দেখে না। কয়েক দিন আগে গিটারটা নামাতে গিয়ে আঙুলেও টান ধরেছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো, যে জীবনটাকে সে এতদিন পরে বাঁচবে বলে রেখে দিয়েছিল, সেই জীবনটাও তো বদলে গেছে।
ইচ্ছেগুলো আছে।
শুধু শরীরটা আর আগের জায়গায় নেই।
সেদিন রাতে অভিক অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারেনি। মনে হচ্ছিল, সে সংসারের জন্য কোনো ভুল করেনি। মেঘের জন্য যা করেছে, মিশির জন্য যা করেছে, বাবা-মায়ের জন্য যা করেছে—কোনোটার জন্য তার আফসোস নেই। আফসোস শুধু এক জায়গায়—নিজের জন্য বাঁচাটাকে সে সবসময় আগামীকালের কাজ ভেবেছে।
পরদিন সকালে নাশতা খাওয়ার সময় হঠাৎ বলল, “নিশি, আজ বিকেলে বের হবে?”
নিশি অবাক হয়ে তাকাল। “কোথায়?”
“কোথাও না। নদীর ধারে যাই। বেশি দূরে না।”
নিশি কিছু বলল না। শুধু হেসে ফেলল।
সেদিন তারা খুব দূরে যায়নি। কোনো বড় ভ্রমণও হয়নি। নদীর ধারে একটা বেঞ্চে পাশাপাশি বসে অনেকক্ষণ গল্প করেছিল।
ফেরার সময় নিশি বলল, “এতদিন পরে?”
অভিক মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ। এবার আর পরে না।”
জীবন থেকে বড় কোনো দিন ফিরে আসে না। ফিরে আসে না হারিয়ে যাওয়া বয়সও। কিন্তু কোনো কোনো মানুষ দেরিতে হলেও বুঝতে পারে—সংসারকে ভালোবাসার জন্য নিজের জীবনটাকে বন্ধক রাখতে হয় না।
কারণ “পরে” বলে রাখা জীবনটা একদিন সত্যিই দরজায় এসে দাঁড়ায়।
তখন হয়তো হাতে সময় থাকে না।
অভিক সেদিন শুধু এতটুকুই শিখেছিল—জীবনটা শেষ করে তারপর বাঁচতে বসা যায় না। বাঁচতে হয়, সেই জীবনটার মাঝখানেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।