মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বিদ‘আত ও কুসংস্কার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
প্রবন্ধ | জানুয়ারি ২০, ২০২৬
মৃত্যু—মানুষের জীবনের সবচেয়ে অনিবার্য সত্য। অথচ এই নিশ্চিত বাস্তবতাকে ঘিরেই সমাজে সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা, কুসংস্কার ও বিদ‘আত গড়ে উঠেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসবের অনেকগুলোই ধর্মের নামে চালু, অথচ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর সঙ্গে এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। অজ্ঞতা, আবেগ ও প্রথার সম্মিলনে আমরা এমন কিছু কাজকে “ইসলাম” ভেবে পালন করছি, যা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের শিক্ষা নয়; বরং তার পরিপন্থী।
এই লেখায় মৃত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিদ‘আত ও কুসংস্কার বিশ্লেষণ করা হলো—দলীল, তাহক্বীক্ব ও বাস্তবতার আলোকে।
১. মুমূর্ষু বা মৃত ব্যক্তির পাশে সূরা ইয়াসীন পাঠ
আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত একটি ধারণা হলো—মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির পাশে সূরা ইয়াসীন পড়লে তার মৃত্যু সহজ হয়, ফেরেশতারা নাযিল হন, এমনকি জান্নাতের পানীয় পান করানো হয়। এই বিশ্বাস এতটাই দৃঢ় যে, কেউ প্রশ্ন তুললে তাকে “দ্বীনের শত্রু” বানিয়ে ফেলা হয়।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সূরা ইয়াসীনের ফযীলত সম্পর্কে যেসব বর্ণনা প্রচলিত, সেগুলোর সবই যঈফ বা জাল। সহীহ হাদীস দ্বারা এ ধরনের কোনো ফযীলত প্রমাণিত নয়। মুহাদ্দিসগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন—এই বর্ণনাগুলোর সনদে মিথ্যুক ও দুর্বল রাবী রয়েছে। সুতরাং মৃত্যুপথযাত্রীর পাশে বিশেষভাবে সূরা ইয়াসীন পড়াকে সুন্নাহ মনে করা একটি স্পষ্ট বিদ‘আত।
ইসলাম আবেগ দিয়ে নয়, দলীল দিয়ে চলে—এ কথা আমাদের মনে রাখতে হবে।
২. মৃত্যুর পর ক্বিবলার দিকে মাথা রাখা
অনেক এলাকায় দেখা যায়, কেউ মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে তার মাথা পশ্চিম দিকে ঘুরিয়ে ক্বিবলার দিকে করা হয়। ধারণা করা হয়, এতে নাকি বিশেষ কল্যাণ আছে।
অথচ এই আমলের পক্ষে যে হাদীসটি প্রচলিত, তা যঈফ ও মুরসাল। সহীহ কোনো দলীল নেই যা প্রমাণ করে যে, মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির মাথা ক্বিবলামুখী করা সুন্নাহ। দ্বীনের নামে এমন কাজ চালু রাখা মানেই হলো—মানুষকে ভুল পথে অভ্যস্ত করা।
৩. মৃত স্বামী বা স্ত্রীকে গোসল করানো নিষেধ—এই ভ্রান্ত ধারণা
সমাজের সবচেয়ে হৃদয়হীন ও অমানবিক কুসংস্কারগুলোর একটি হলো—স্বামী বা স্ত্রী মারা গেলে অপরজন নাকি তাকে দেখতে বা গোসল করাতে পারে না; কারণ “তালাক হয়ে যায়”।
এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং সুন্নাহবিরোধী ধারণা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই বলেছেন—তিনি যদি আয়েশা (রাঃ)-এর আগে মারা যেতেন, তবে আয়েশাই তাঁকে গোসল দিতেন, কাফন পরাতেন ও দাফন করতেন। আরও প্রমাণ রয়েছে যে, আলী (রাঃ) ও আসমা বিনতে উমাইস (রাঃ) ফাতিমা (রাঃ)-কে গোসল দিয়েছিলেন।
অতএব স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে গোসল দেওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি হকদার। এর বিপরীত কথা বলা মানে সরাসরি সুন্নাহ অস্বীকার করা।
৪. মৃত্যুর পর চুল, নখ কাটা
মৃত ব্যক্তির গোসলের সময় চুল, নখ কাটা কিংবা শরীর “পরিষ্কার” করার নামে নানান বাড়াবাড়ি আমাদের সমাজে খুব সাধারণ বিষয়। অথচ এ সবের কোনো সহীহ দলীল নেই।
যে বর্ণনার ওপর এই কাজগুলো চালু আছে, তা দুর্বল। বরং মৃত ব্যক্তিকে যেভাবে পাওয়া যায়, সেভাবেই গোসল দিয়ে কাফন পরানোই সুন্নাহ। কুলুখ করানো, দাঁত খিলাল করা, পেট টিপে ময়লা বের করার মতো কাজগুলো স্পষ্ট বিদ‘আত।
৫. তিনের বেশি কাপড়ে কাফন—একটি প্রচলিত ভুল
পুরুষ ও নারীর জন্য কাফনের ক্ষেত্রে সহীহ সুন্নাহ হলো—তিন কাপড়। নারীদের জন্য পাঁচ বা সাত কাপড়ের যে ধারণা সমাজে প্রচলিত, তার পক্ষে কোনো সহীহ হাদীস নেই। এ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো সবই যঈফ বা মুনকার।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে তিন কাপড়েই কাফন দেওয়া হয়েছিল—এটি সহীহ বুখারী ও মুসলিম দ্বারা প্রমাণিত। ওমর (রাঃ) স্পষ্টভাবে বলেছেন—সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না; আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।
আরও কিছু প্রচলিত বিদ‘আত ও কুসংস্কার
মৃত্যুর আগে বা পরে বিশাল খানার আয়োজন
মৃতের নামে এমন সদকা, যা সবাই মিলে খায়
জানাযার পেছনে উচ্চস্বরে তাকবীর ও যিকির
কবরে গোলাপ জল ছিটানো
খাটলির কাপড়ে আয়াত লেখা
শোক দিবস পালন
নির্দিষ্ট দিনে কবর যিয়ারত বাধ্যতামূলক করা
মাইকে কুরআন বাজানো
শবে বরাত বা শবে মিরাজে কবরস্থানে রাত জাগা
মাজার, দরগাহে মানত করা—এগুলো সরাসরি শিরকের দিকে নিয়ে যায়
মৃত্যু আমাদের অহংকার ভাঙার জন্য আসে, অথচ আমরা সেই মৃত্যুকেই বিদ‘আত ও কুসংস্কারে ঢেকে ফেলি। দ্বীন আবেগের নাম নয়—এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। যে আমলের পক্ষে সহীহ দলীল নেই, তা যত জনপ্রিয়ই হোক, গ্রহণযোগ্য নয়।
আজ আমাদের প্রয়োজন প্রশ্ন করা, যাচাই করা এবং সুন্নাহয় ফিরে আসা। মৃতের উপকার হবে আবেগে নয়—সঠিক আমলে।
#বিদআতবিরোধী
#সহীহসুন্নাহ
#ইসলামেরনামেকুসংস্কার
#ReturnToSunnah
#StopBidah
#ইসলাম_বুঝে_চলি
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।