নীরব মানুষটার শেষ সীমা
পর্ব–১ : কথা বলতে বলতে মানুষটা একদিন চুপ
হয়ে গেল
একটি ধারাবাহিক গল্প
লেখক: মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
১০ জুলাই, ২০২৬
“মানুষটা আগের মতো নেই। এখন আর কিছুই বলে না।”
নিশি কথাটা বলেছিল বিরক্ত হয়ে। কিন্তু একবারও ভাবেনি, মানুষটা বদলে গেছে, নাকি বদলাতে বদলাতে একসময় আর কিছু বলার শক্তিই হারিয়ে ফেলেছে।
অভিক এমন ছিল না।
অফিস থেকে ফিরেই বলত,
“শোনো, আজ অফিসে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে।”
কখনো একটা বই কিনে আনত। কখনো বলত,
“শুক্রবার চলো, একটু বাইরে ঘুরে আসি।”
মাসে একদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা ছিল। সুযোগ পেলেই মা-বাবার কাছে যেত। ছোট ছোট এই জিনিসগুলোতেই ওর ভালো থাকা ছিল।
বিয়ের প্রথম কয়েক মাস সব ঠিকই ছিল।
তারপর ধীরে ধীরে সব বদলাতে শুরু করল।
একদিন নিশি বলল,
“এত বড় মানুষ হয়ে এখনও বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে হবে? এখন সংসার করো। এসব একটু কমাও।”
অভিক হেসে বলল,
“আরে, মাসে তো একদিনই যাই।”
“একদিন হোক, তবু আমার ভালো লাগে না।”
অভিক আর কিছু বলল না।
পরের মাসে বন্ধুরা ফোন করল।
“তোরা যা, আমি এবার থাক।”
এরপর একদিন মা ফোন করলেন।
“বাবা, শুক্রবার যদি একটু আসতে পারিস...”
অভিক উত্তর দেওয়ার আগেই নিশি বলে উঠল,
“আবার? গত মাসেও তো গিয়েছিলেন।”
অভিক একটু চুপ থেকে বলল,
“মা, এই সপ্তাহে পারব না। পরে আসব।”
ফোন রাখার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল।
নিশি শুধু বলল,
“সংসার করলে একটু বদলাতেই হয়।”
অভিক মাথা নাড়ল।
হয়তো বদলাতে হয়।
কিন্তু নিজের সবটুকু বদলে দিয়ে?
ধীরে ধীরে ওর ছোট ছোট আনন্দগুলো হারিয়ে যেতে লাগল।
গিটারটা আলমারির ওপর পড়েই থাকত। ধুলো জমত।
নতুন বই কেনা বন্ধ হয়ে গেল।
বন্ধুদের ফোনও একসময় কমে গেল।
যে মানুষটা ছুটির দিনের অপেক্ষায় থাকত, সে একসময় ছুটির দিনেও কোথাও যেতে চাইত না।
অভিক ঝগড়া করেনি। চিৎকারও করেনি।
শুধু নিজের ইচ্ছেগুলো একটার পর একটা সরিয়ে রেখেছে।
নিশি প্রায়ই বলত,
“আমি যা বলি, তোমার ভালোর জন্যই বলি।”
শুরুতে অভিক উত্তর দিত।
তারপর শুধু শুনত।
শেষে সেটাও না।
বাইরের মানুষ অবশ্য অন্য ছবিটাই দেখত।
পাড়ার লোক বলত,
“কী ভদ্র ছেলে! বউকে কত সম্মান করে!”
আত্মীয়রা বলত,
“আহা, কী সুন্দর সংসার!”
অভিক শুধু হেসে দিত।
কেউ বুঝত না, ওই হাসিটা অনেক দিন ধরেই শুধু মুখে আছে।
একদিন বিকেলে কলেজের বন্ধু রাকিব অফিসে এসে বলল,
“চল, চা খেয়ে আসি।”
অভিক একটু থেমে বলল,
“আজ থাক... আরেকদিন।”
রাকিব হেসে বলল,
“তুই তো এখন সবকিছুর উত্তরই ‘আরেকদিন’ দিস।”
কথাটা মজা করেই বলা।
তবু অদ্ভুতভাবে গিয়ে লাগল অভিকের ভেতরে।
বাসায় ফেরার পথে সে নিজেকেই প্রশ্ন করল—
শেষ কবে নিজের ইচ্ছায় কোথাও গিয়েছিল?
শেষ কবে নিজের জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?
অনেক চেষ্টা করেও উত্তরটা মনে পড়ল না।
সেদিন রাতে খেতে খেতে নিশি বলল,
“কাল থেকে অফিস শেষে সোজা বাসায় আসবে। অযথা বাইরে থাকার দরকার নেই।”
অভিক মাথা নিচু করে শুধু বলল,
“আচ্ছা।”
একটা সময় এই মানুষটাই একটা বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারত।
এখন সব উত্তরের জায়গায় একটাই শব্দ।
“আচ্ছা।”
নিশি ভেবেছিল, সব ঠিক আছে।
সে বুঝতে পারেনি, মানুষ যখন প্রতিবাদ করা ছেড়ে দেয়, তখন সে সবসময় মানিয়ে নেয় না।
কখনো কখনো সে শুধু ভেতর থেকে নিভে যেতে শুরু করে।
আর যে মানুষটা সত্যিই নিভে যায়...
সে একদিন ঝগড়া করে না।
কোনো ঘোষণা দেয় না।
সে শুধু চুপচাপ চলে যায়।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।