সিরিজের নামঃ- নিজের জীবনটাও ছিল
গল্প৩-মানুষটা কখনো না বলেনি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১০ আগষ্ট, ২০২৬
সে কখনো কাউকে না বলতে পারেনি। শুধু নিজের জীবনটাকেই রোজ একটু একটু করে না বলে গেছে।
অভিক মানুষটা এমনই। অফিসে কেউ বাড়তি কাজ চাপিয়ে দিলে না করতে পারে না। বাড়িতে নিশি কিছু বললে, মেঘ আর মিশি কিছু চাইলে তার মুখে সেই একই কথা—“আচ্ছা, দেখি।”
যেন কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া তার স্বভাবের বাইরে। অন্যের প্রয়োজনটা তার কাছে সবসময় একটু বেশি জরুরি মনে হয়, আর নিজের প্রয়োজনটা কখন যে তালিকার একেবারে নিচে চলে গেছে, সে নিজেও খেয়াল করেনি।
মেঘের কলেজের ফি দিতে হবে বলে নিজের নতুন শার্ট কেনাটা পিছিয়ে দেয়। মিশিকে আঁকার ক্লাসে ভর্তি করাতে হবে বলে পুরোনো জুতোটাই আরেকটু চালিয়ে নেয়।
নিশি একদিন বলেছিল,
“এই মাসে একটু কোথাও ঘুরে আসি?”
অভিক হেসে বলেছিল, “এই খরচগুলো মিটুক, তারপর যাব।”
সেই “তারপর” কথাটা কত বছর ধরে যে তাদের সঙ্গে আছে, তার কোনো হিসাব নেই।
অভিকের নিজেরও একটা শখ ছিল—গিটার বাজানো। অনেক বছর আগে নিজের জমানো টাকা দিয়ে গিটারটা কিনেছিল। তখন সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে বারান্দায় বসে বাজাত। নিশি রান্নাঘর থেকে শুনত, মেঘ ছোট ছিল, মিশি তখনও জন্মায়নি। সময়ের সঙ্গে সংসার বড় হয়েছে, খরচ বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে। গিটারটা একদিন আলমারির মাথায় উঠে গেল। মাঝে মাঝে ধুলো ঝাড়তে গিয়ে অভিক হাত বুলিয়ে দেয়, কিন্তু নামায় না।
নিজের কাছেই বলে, “সময় কোথায়?”
তাকে সবাই ভালো মানুষ বলে। দায়িত্ববান, সংসারী, নির্ভরযোগ্য। কথাটা ভুলও নয়। কিন্তু মানুষকে শুধু তার দায়িত্ব দিয়ে মাপলে তার ভেতরের ক্লান্তিটা দেখা যায় না। অভিক খুব ক্লান্ত থাকলেও মুখে সেটা প্রকাশ করে না।
নিশি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি এত চুপচাপ কেন?”
অভিক হেসে বলে, “কিছু না।”
এই “কিছু না” কথাটা বলতে বলতে একসময় সেটাই তার অভ্যাস হয়ে গেছে।
নিজের কষ্টের কথা বললে সংসারে চাপ বাড়বে—এই ভয়টা তার ভেতরে অনেকদিনের। মেঘের পড়াশোনা আছে, মিশির ভবিষ্যৎ আছে, নিশির নিজেরও কিছু ছোট ছোট ইচ্ছে আছে। সবার সামনে নিজের ক্লান্তিটাকে তুলে ধরতে তার কেমন যেন সংকোচ হয়। মনে হয়, এত মানুষের এত কিছু সামলাতে হচ্ছে, তার আবার আলাদা করে কষ্ট দেখানোর কী আছে? তাই চুপ থাকে। শক্ত থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু শক্ত থাকতে থাকতে ভেতরের মানুষটাও যে ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, সেটা কাউকে বলে না।
একদিন অফিস থেকে ফিরে অভিক সোফায় বসেছিল। টিভি চলছিল। এক কোণে মিশি পড়ছিল, রান্নাঘরে নিশি ব্যস্ত। ঘর ভর্তি আপন মানুষ। তবু সেদিন হঠাৎ তার মনে হলো, সে ভীষণ একা। কারও সঙ্গে কথা বলার মতো কোনো বিশেষ কথা নেই। শুধু মনে হলো, অনেকদিন ধরে সে নিজের সঙ্গে বসে কথা বলেনি। জীবনে কাউকে না বলতে না বলতে নিজের ইচ্ছেগুলোকেই কতবার যে থামিয়েছে, তার হিসাব নেই।
ঠিক তখন মেঘ এসে পাশে বসল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “বাবা, তুমি সবসময় আমাদের জন্য করো। তুমি কখনো নিজের জন্য কিছু চাও না?”
অভিক মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। এত সহজ একটা প্রশ্নের উত্তর তার মাথায় এল না।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিশি কথাটা শুনেছিল। সে এসে অভিকের পাশে বসল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“সবাইকে দিতে দিতে তুমি নিজেকেই যেন ভুলে যাচ্ছ।”
অভিক হেসে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। পারল না।
সেদিন রাতে অনেকদিন পর সে আলমারির মাথা থেকে গিটারটা নামাল। ধুলো মুছতে মুছতে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল। তারগুলো একটু ঢিলে হয়ে গেছে। আঙুল রাখতেই পুরোনো সুরের বদলে কর্কশ একটা শব্দ বের হলো। অভিক আবার চেষ্টা করল। এবারও ঠিক হলো না। তবু গিটারটা নামিয়ে রাখল না।
বারান্দায় বসে সে অনেকক্ষণ বাজাল। সুর পুরোপুরি ঠিক ছিল না। কোথাও কোথাও বেসুরো হয়ে যাচ্ছিল। পাশের ঘর থেকে নিশি একবার তাকিয়ে মৃদু হাসল।
অভিকও হাসল।
সেদিন সে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেয়নি। শুধু এতটুকু বুঝেছিল—সংসারের মানুষগুলোর জন্য থাকা জরুরি, কিন্তু নিজের জীবনটা পুরোপুরি সরিয়ে রেখে নয়।
সবসময় “আচ্ছা, দেখি” বলতে বলতে একদিন যদি নিজের কাছেই প্রশ্ন আসে—“আমার কী চাই?”—তখন তার উত্তরটাও জানা দরকার।
অভিক সেদিন প্রথমবার নিজের জন্য একটা সন্ধ্যা রেখে দিল।
খুব ছোট একটা ব্যাপার।
কিন্তু অনেকদিন পর সেটাই ছিল তার নিজের।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।