সাইকোলজিক্যাল থ্রিলা
গল্প-৪
যে মানুষটা আমাকে চিনত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প
৯, জুলাই, ২০২৬
অফিসে যাওয়ার পথে একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে প্রায়ই দাঁড়ায় অভিক।
চা শেষ করতে পাঁচ মিনিটও লাগে না। তবু এই পাঁচ মিনিটটা ছাড়া যেন দিনটা ঠিক শুরু হয় না।
সেদিন কাপটা নামাতেই রাস্তার ওপাশ থেকে একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ তার দিকে তাকিয়ে হেসে হাত নাড়লেন।
অভিক একটু অবাক হলো।
চারপাশে তাকিয়ে দেখল, অন্য কাউকে ডাকছেন কি না।
না।
লোকটার চোখ তার দিকেই।
অভিক ভদ্রতার খাতিরে হালকা মাথা নেড়ে চলে গেল।
মনে হলো, হয়তো ভুল হয়েছে।
কিন্তু পরদিনও একই ঘটনা।
একই সময়।
একই হাসি।
তৃতীয় দিন নিশিও সঙ্গে ছিল।
লোকটাকে দেখেই নিশি আস্তে বলল,
উনি কি তোমার পরিচিত?
না।
কিন্তু উনি তো তোমাকে চিনেই হাসছেন।
অভিকও সেটা বুঝছিল।
শুধু উত্তরটা জানত না।
পরদিন সে নিজেই রাস্তা পার হয়ে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
লোকটা মৃদু হেসে বললেন,
কেমন আছো?
অভিক একটু ইতস্তত করে বলল,
আপনি... আমাকে চেনেন?
লোকটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন,
মনে নেই?
অভিক মাথা নাড়তেই মানুষটার হাসিটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেল।
থাক... মনে করার জন্য জোর করতে নেই।
এই বলে তিনি হাঁটতে শুরু করলেন।
বাড়ি ফিরে ঘটনাটা নিশিকে বলল অভিক।
সব শুনে নিশি জিজ্ঞেস করল,
মুখটা একেবারেই অচেনা?
অভিক একটু ভেবে বলল,
অচেনা... আবার পুরোপুরি অচেনাও না। যেন কোথাও দেখেছি। মনে পড়ছে না।
সেই রাতেই পুরোনো অ্যালবাম বের করল।
স্কুলের ছবি।
কলেজের ছবি।
পিকনিক।
কোথাও মানুষটার মুখ নেই।
তবু মনে হচ্ছিল, উত্তরটা খুব কাছেই আছে।
দুই দিন পর আবার দেখা।
এবার লোকটা শুধু একটা প্রশ্ন করলেন।
বাঁ হাতের কনুইয়ের দাগটা আছে এখনো?
অভিক যেন থমকে গেল।
হাতা গুটিয়ে দাগটার দিকে তাকাল।
ছোট্ট একটা কাটা দাগ।
ছোটবেলার।
কিন্তু এই মানুষ জানলেন কী করে?
সেদিনই মায়ের কাছে গেল সে।
মা অনেক খুঁজে একটা পুরোনো টিনের ট্রাঙ্ক বের করলেন।
হলদে হয়ে যাওয়া ছবিগুলো উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটা ছবিতে অভিকের চোখ আটকে গেল।
আট-নয় বছরের সে।
পাশে আরেকটা ছেলে।
পেছনে দাঁড়িয়ে একজন তরুণ শিক্ষক।
অভিক ছবিটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
উনি কে?
মা ছবিটার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলেন।
তোমাদের স্কুলের মাস্টারমশাই।
একদিন নদীতে পড়ে গিয়েছিলে তোমরা দুজন। উনিই ঝাঁপ দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন।
তোমার মাথায়ও আঘাত লেগেছিল।
তারপর অনেক দিনের কথা তুমি ভুলে গিয়েছিলে।
পরদিন অভিক আবার সেই চায়ের দোকানে গেল।
লোকটা আগের মতোই দাঁড়িয়ে ছিলেন।
এবার অভিক ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
তারপর শুধু বলল,
স্যার...
লোকটা তাকিয়ে রইলেন।
অভিক ছবিটা বাড়িয়ে দিল।
ছবিটা দেখে মানুষটার চোখ ভিজে উঠল।
তিনি আস্তে জিজ্ঞেস করলেন,
মনে পড়েছে?
অভিক মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
সবটা না।
তবে এটুকু বুঝেছি... আপনি আমার কাছে অচেনা ছিলেন না।
অচেনা ছিল আমার স্মৃতিটা।
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর হালকা হেসে বললেন,
আমি তো চাইনি তুমি আমাকে মনে রাখো।
মাঝে মাঝে শুধু ভাবতাম... ছেলেটা ভালো আছে তো?
অভিক আর কিছু বলতে পারল না।
শুধু মানুষটার হাতটা আলতো করে ধরল।
হাতটা রুক্ষ।
বয়সের ছাপ স্পষ্ট।
তবু স্পর্শটা অদ্ভুতভাবে চেনা লাগছিল।
ফিরে আসার পথে নিশি জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
মানুষকে আমরা সব সময় ভুলে যাই না।
কখনো কখনো স্মৃতিটাই পথ হারিয়ে ফেলে।
অভিক কোনো উত্তর দিল না।
চায়ের দোকানটা তখন অনেক দূরে।
তবু তার মনে হচ্ছিল, জীবনে প্রথমবার নয়, অনেক বছর পর আবার একজন খুব চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হলো।
যাকে ভুলে গিয়েছিল সে নয়।
ভুলে গিয়েছিল তার স্মৃতি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।