ইল্লিয়ীন ও সিজ্জীন
(মৃত্যুর পর আত্মার দুই বিপরীত গন্তব্য)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
প্রবন্ধ | জানুয়ারি ০১, ২০২৬
আজ নতুন বছরের প্রথম দিন। সকালে চায়ের কাপ হাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম—মৃত্যু কত কাছে! এক মুহূর্তের ব্যাপার। আর মৃত্যুর পর আমাদের আত্মা কোথায় যায়? কুরআনের সুরা মুতাফফিফীনে দুটি রহস্যময় শব্দ এসেছে: **ইল্লিয়ীন** আর **সিজ্জীন**। এগুলো শুনলে গা শিউরে ওঠে, কারণ এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের চিরন্তন ভাগ্য।
**ইল্লিয়ীন** আরবি শব্দ, যার মূল অর্থ উচ্চতর স্থান বা সম্মানিত অবস্থান। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“কখনো না! নিশ্চয় সৎকর্মশীলদের আমলনামা ইল্লিয়ীনে রয়েছে। আর আপনি কি জানেন ইল্লিয়ীন কী? এটা এক লিপিবদ্ধ আমলনামা—যাকে দেখেন আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা।” (সুরা মুতাফফিফীন: ১৮-২১)
তাফসীরে (যেমন ইবনে কাসীর বা অন্যান্য) বলা হয়, ইল্লিয়ীন হলো নেককারদের আমলনামার সংরক্ষিত স্থান—সপ্তম আসমানের উপরে বা আরশের কাছাকাছি এক উচ্চতর জগতে। যারা ঈমান নিয়ে সৎকর্ম করে মৃত্যুবরণ করেন, তাদের আত্মা কিয়ামতের আগ পর্যন্ত সেখানে শান্তিতে অবস্থান করে। সেখানে পরম স্বস্তি, আলোকোজ্জ্বল পরিবেশ আর আল্লাহর রহমতের ছোঁয়া। যেন এক অপার্থিব প্রশান্তি—যা দুনিয়ার কোনো সুখের সাথে তুলনা করা যায় না।
অন্যদিকে, **সিজ্জীন**—এ শব্দটি ‘সিজন’ থেকে এসেছে, যার অর্থ কারাগার বা নিম্নতম স্থান। কুরআনে বলা হয়েছে:
“কখনো না! নিশ্চয় পাপিষ্ঠদের আমলনামা সিজ্জীনে রয়েছে। আর আপনি কি জানেন সিজ্জীন কী? এটা এক লিখিত আমলনামা।” (সুরা মুতাফফিফীন: ৭-৯)
তাফসীরে এসেছে, সিজ্জীন হলো পাপীদের আমলনামার স্থান—সপ্তম যমীনের নিচে বা অত্যন্ত নিম্নতর অন্ধকার জগতে। যারা কুফরি বা গুনাহে ডুবে মৃত্যুবরণ করে, তাদের আত্মা সেখানে বন্দী হয়ে যন্ত্রণা ভোগ করে। কোনো শান্তি নেই, কেবল অশান্তি, অন্ধকার আর আফসোসের আগুন।
তাসাউফের দৃষ্টিতে এর ব্যাখ্যা আরও গভীর। অলী-আল্লাহগণ বলেন, নেককারের আত্মা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করে, তাই ইল্লিয়ীনে তার জন্য শান্তির দুয়ার খোলে। আর পাপীর আত্মা আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছটফট করে—দেহের কাছে ফিরে আসতে চায়, কিন্তু দেহ তো ধ্বংস হয়ে যায়। এই অসহায়ত্বই সিজ্জীনের যন্ত্রণা।
ভাবুন তো, আমাদের প্রতিটি কাজ—ছোট হোক বা বড়—এই দুই গন্তব্যের একটির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একটা নামাজ কাজা করা, একটা মিথ্যা বলা, অন্যের হক মারা—এগুলো সিজ্জীনের পথে নিয়ে যায়। আর একটা তওবা, একটা সদকা, একটা ভালো কাজ—ইল্লিয়ীনের দিকে।
আজ যদি একটু থামি, সচেতন হই, পাপ থেকে ফিরি—তাহলে ইল্লিয়ীনের পথ সহজ হয়ে যাবে। এই চিন্তা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে, কিন্তু এই অস্বস্তিই জাগরণের শুরু। আপনার মনেও কি এ প্রশ্ন জাগছে—আমার গন্তব্য কোনটি?
নতুন বছরের শুরুতে এটাই প্রার্থনা: আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইল্লিয়ীনের পথে চলার তৌফিক দিন।
#ইল্লিয়ীন #সিজ্জীন #মৃত্যুরপর #আখিরাত #কুরআনেররহস্য #আত্মারযাত্রা #সৎকর্ম #পাপথেকেফিরুন #তাসাউফ #আল্লাহররহমত #নতুনবছরেরচিন্তা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।