উপন্যাসঃ-ছইয়ের নিচে জীবন
গল্প-৬-হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৬ জুলাই, ২০২৬
সময়ের স্রোতে শুধু নদী নয়, হারিয়ে যাচ্ছে শত বছরের এক সংস্কৃতিও।
নদীর বাঁকে বাঁকে ছই তোলা কাঠের নৌকা, ঘাটে সার বেঁধে দাঁড়ানো রঙের মেলা আর জলের ওপর ভেসে বেড়ানো এক চিরন্তন যাযাবর জীবন — বাংলার চিরচেনা রূপের সঙ্গে বেদে সম্প্রদায় জড়িয়ে আছে অঙ্গাঙ্গিভাবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল তাদের স্বকীয় জীবনধারা। তাদের মন্ত্রপাঠ, সাপের ঝাঁপি, শিকড়-বাকড়ের কবিরাজি চিকিৎসা আর ঢোলকের তালে মেঠোপথে মানুষের মন জয় করা রূপকথা একসময় গ্রাম-বাংলার বিনোদন ও স্বাস্থ্যসেবার প্রধান অনুষঙ্গ ছিল। এই জলজ সংস্কৃতির নিজস্ব এক সুর ছিল, ছিল বাঁধনহারা বাঁচার এক দর্শন।
ভোরবেলা নদীর জলে যখন সোনালি আলো এসে পড়ত, তখন বেদে বহরের ঘাটগুলোতে শুরু হতো কর্মচঞ্চলতা। নারীরা কাঁধে রঙিন ঝুলি ঝুলিয়ে, হাতে কাঁসার থালা কিংবা কাচের শিশি নিয়ে পা বাড়াতেন মেঠোপথের দিকে। ঘরে ঘরে গিয়ে দাঁতের পোকা বের করা, বাতের ব্যথার তেল বিক্রি কিংবা ঝাড়ফুঁকের পসরা সাজিয়ে বসতেন। অন্যদিকে পুরুষেরা বাঁশের বাঁকে কাঠের ঝাঁপিতে বিষধর সাপ নিয়ে ছুটতেন দূরের হাটে-বাজারে। বাঁশির সুর আর সাপের ফণা তোলার সেই রোমাঞ্চকর দৃশ্য দেখতে উঠোনে জড়ো হতো শত শত মানুষ। এটা কেবল পেটের তাগিদ ছিল না, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে আসা এক লোকশিল্পের প্রকাশও ছিল।
কিন্তু সময়ের নির্মম আবর্তে আধুনিকতার হাওয়া এসে যখন থাবা বসাল, তখন থমকে যেতে শুরু করল এই শতবর্ষী ঐতিহ্যের গতিপথ। একসময় যা ছিল মানুষের কৌতূহল আর বেদেদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন, প্রযুক্তি আর ডিজিটাল সভ্যতার ভিড়ে তা আজ দিশেহারা।
আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা আর বিজ্ঞানচেতনা পৌঁছে গেছে গ্রামের আনাচে-কানাচে। ফলে গাছের শিকড়-বাকড় কিংবা সাপের বিষ নামানোর অলৌকিক ব্যবসার ওপর মানুষের আর আগের মতো আস্থা নেই। অন্যদিকে ঘরে ঘরে রঙিন টেলিভিশন আর হাতের মুঠোয় স্মার্টফোন আসার পর সাপের খেলা, বানর নাচ কিংবা ঝাড়ফুঁক দেখার সেই উৎসুক ভিড়ও আর জমে না। মানুষ এখন পর্দার কৃত্রিম বিনোদনে অভ্যস্ত, ফলে খোলা আকাশের নিচে মেঠোপথের এই লোকজ খেলাগুলো তাদের কাছে আকর্ষণ হারিয়েছে।
এর ফলে বংশপরম্পরায় আঁকড়ে ধরা পেশাগুলো আজ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। আধুনিক জীবনযাত্রার চাপে বেদেদের এই পেশাভিত্তিক ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সারাদিন মাইলের পর মাইল হেঁটেও যখন এক মুঠো চাল কেনার মতো আয় হয় না, তখন ঐতিহ্য রক্ষার চেয়ে পেটের ক্ষুধাই বড় হয়ে ওঠে।
আজ এই সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্ম আর সাপের ঝাঁপি কিংবা কবিরাজির পাত্র কাঁধে তুলে নিতে চাইছে না। জীবনের অনিশ্চয়তা আর সমাজের তাচ্ছিল্য থেকে মুক্তি পেতে তারা পৈতৃক পেশা ছেড়ে সরে আসছে। নদীর জল আর ছইওয়ালা নৌকার বাঁধন ছিঁড়ে তারা পা বাড়াচ্ছে ডাঙার স্থায়ী জীবনের খোঁজে — কেউ শহরের দিনমজুর, কেউ ভ্যানচালক, কেউবা পোশাক কারখানার শ্রমিক হিসেবে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
এতে কেবল একটি জনগোষ্ঠী পেশা বদলাচ্ছে না, এর মধ্য দিয়ে নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির একটি রঙিন অধ্যায়।
কোনো দেশের ইতিহাস কেবল ইট-পাথরের রাজপ্রাসাদ, জাদুঘর কিংবা বইয়ের পাতায় লেখা দলিলে থাকে না। তা ছড়িয়ে থাকে এমন জীবন্ত লোকজ ঐতিহ্যের মধ্যেও। তাই সময় এসেছে বেদে সম্প্রদায়ের এই স্বকীয় সংস্কৃতি, তাদের বাঁশি আর শিল্পের ইতিহাসকে আধুনিক উপায়ে সংরক্ষণ করার। যে ঐতিহ্য একসময় বাংলার গ্রামগুলোকে প্রাণবন্ত করে রাখত, তাকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দেওয়া কোনো সচেতন সমাজের কাজ হতে পারে না।
ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি যদি এই মানুষগুলোর জন্য শিক্ষা আর টেকসই জীবিকার ব্যবস্থা করা না যায়, তবে হয়তো আর এক-দুই দশকের মধ্যেই বেদেদের এই জলের জীবন, সাপের বাঁশি আর রঙিন গল্পগুলো কেবল ইতিহাসের পাতাতেই থেকে যাবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।