হারিয়ে যাওয়া গ্রামের গল্প
শেষ পল্লীগানের আসর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ০২ আগষ্ট, ২০২৬
একটা সময় ছিল, গ্রামের রাত মানেই ছিল পল্লীগানের আসর। কারও বাড়ির বড় উঠোনে, কখনো বটগাছের ছায়ায়, সন্ধ্যা নামলেই মানুষ জড়ো হতে শুরু করত। একজন হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছেন, পাশে দোতারা। খবর ছড়িয়ে পড়তেই একে একে সবাই চলে আসত। কেউ মাদুর হাতে, কেউ পিঁড়ি নিয়ে, কেউ আবার দাঁড়িয়েই শুনবে বলে ভিড়ের পাশে জায়গা করে নিত।
রাত যত গভীর হতো, আসর তত জমে উঠত। গানের ফাঁকে গল্প, হাসি, খুনসুটি—সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি হতো, যেন পুরো গ্রাম এক উঠোনে এসে বসেছে। তখন গান শুধু শোনার বিষয় ছিল না, মানুষে মানুষে সম্পর্ক গড়ে তোলারও এক সহজ উপলক্ষ ছিল।
পল্লীগানের ভেতরেই ছিল গ্রামের জীবন। মাঠের কথা ছিল, নদীর কথা ছিল, প্রেম ছিল, বিচ্ছেদ ছিল, অভাব ছিল, আশা ছিল। যারা শুনত, তারা অন্যের কণ্ঠে নিজের জীবনেরই প্রতিধ্বনি খুঁজে পেত। তাই রাত কেটে ভোর হয়ে গেলেও কারও বিরক্তি আসত না।
আজ গ্রামে মাইক আছে, বড় বড় সাউন্ড বক্স আছে, আলো ঝলমলে অনুষ্ঠানও হয়। কিন্তু সেই পল্লীগানের আসর আর তেমন চোখে পড়ে না। আগে সন্ধ্যা নামলে মানুষ উঠোনে বেরিয়ে আসত, এখন বেশির ভাগ মানুষ ঘরে বসেই মোবাইলের পর্দায় ডুবে থাকে। কেউ ভিডিও দেখে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটায়। একই বাড়িতে থেকেও একসঙ্গে বসে গল্প করার অভ্যাস যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
তবে এর জন্য শুধু প্রযুক্তিকে দোষ দিলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, বিনোদনের ধরনও বদলেছে। নতুন প্রজন্ম নতুন গান শুনবে, নতুন মাধ্যম বেছে নেবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নতুনকে গ্রহণ করতে গিয়ে যদি নিজের শিকড়কেই ভুলে যাই, তখনই উদ্বেগের কারণ তৈরি হয়। কারণ পল্লীগান শুধু একটি গানের ধারা নয়; এটি আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, আমাদের ইতিহাস এবং আমাদের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আমাদের গ্রামেও এমন কয়েকজন মানুষ ছিলেন, যাঁদের গানের আসর বসবে শুনলেই আলাদা করে কাউকে ডাকতে হতো না। মানুষ নিজে থেকেই চলে আসত। তাঁদের হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গীতশিক্ষা ছিল না, কিন্তু কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত টান। তাঁরা গান শুরু করলে কখন রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যেত, কেউ টেরই পেত না।
আজ তাঁদের অনেকেই আর বেঁচে নেই। তাঁদের সঙ্গে হারিয়ে গেছে অসংখ্য গানও। কারণ সেই গানগুলোর অনেকই কখনো লিখে রাখা হয়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেগুলো শুধু মানুষের মুখে মুখেই বেঁচে ছিল। মানুষ হারিয়েছে, আর তার সঙ্গে হারিয়ে গেছে স্মৃতির এক অমূল্য ভাণ্ডার।
তবু আশার কথা আছে। এখনো দেশের অনেক গ্রামে পল্লীগানের আসর বসে। অনেক তরুণ পুরোনো গান সংগ্রহ করছেন, মোবাইলে রেকর্ড করে সংরক্ষণ করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এই ছোট ছোট উদ্যোগই প্রমাণ করে, লোকসংস্কৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
প্রশ্ন হলো, আমরা কী করতে পারি?
প্রথমত, গ্রামের মেলা, নবান্ন উৎসব কিংবা ঈদের পরের দিনের আয়োজনে অন্তত এক ঘণ্টার জন্য হলেও পল্লীগানের একটি আসর রাখা যেতে পারে। আধুনিক গানের পাশাপাশি লোকগানেরও একটি সম্মানজনক স্থান থাকা দরকার।
দ্বিতীয়ত, নতুন প্রজন্মকে এই গানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। শুধু বই পড়ে লোকসংস্কৃতিকে জানা যায় না। প্রবীণ শিল্পীদের স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের গান ও অভিজ্ঞতা শোনানোর ব্যবস্থা করা গেলে শিশু-কিশোরেরা নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে নতুনভাবে চিনতে শিখবে।
তৃতীয়ত, এখনো মানুষের মুখে মুখে যে গানগুলো টিকে আছে, সেগুলো যত দ্রুত সম্ভব সংরক্ষণ করতে হবে। খাতায় লিখে রাখা, মোবাইলে রেকর্ড করা কিংবা ভিডিও ধারণ—যেকোনো উপায়েই হোক, এই সম্পদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে হবে।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু গানের নয়; বিষয়টি মানুষের। একটি সমাজ তখনই প্রাণবন্ত থাকে, যখন তার মানুষ একসঙ্গে বসে, গল্প করে, গান শোনে এবং একে অন্যের কথা মন দিয়ে শোনার সময় বের করে। পল্লীগানের আসর সেই মিলনমেলারই একটি সুন্দর নাম।
আজও কোথাও হঠাৎ হারমোনিয়ামের সুর ভেসে এলে পা থেমে যায়। মনে হয়, যদি আর একবার গ্রামের সেই উঠোনে এমন একটি আসর বসত! এক পাশে প্রবীণেরা নীরবে শুনছেন, অন্য পাশে শিশুরা দৌড়ে বেড়াচ্ছে, আর সন্ধ্যার নরম অন্ধকার ভেদ করে ভেসে আসছে দোতারার সুর। তখন হয়তো আবার মনে হবে, গান কখনো হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যায় আমাদের অভ্যাস, আমাদের সময়, আমাদের একসঙ্গে থাকার ইচ্ছেটুকু।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।