নিশি উপাখ্যান সিরিজ
গল্প-৫
হারিয়ে যাওয়া আমি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৯, জুন ২০২৬
বিচ্ছেদের তিন মাস পর এক সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিশি হঠাৎ থমকে গেল। মুখটা তারই। চোখ দুটোও। তবু মনে হলো, এই মানুষটাকে সে যেন ঠিক চেনে না।
শেষ কবে নিজের জন্য একটা শাড়ি কিনেছিল?
শেষ কবে কোনো বই পড়তে পড়তে রাত হয়ে গিয়েছিল?
শেষ কবে কোনো সিদ্ধান্ত শুধু নিজের ইচ্ছায় নিয়েছিল? মনে করতে পারল না। এক সময় এসবই ছিল তার জীবনের খুব স্বাভাবিক অংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার অনেক স্বপ্ন ছিল। শিক্ষক হবে। একটা ছোট্ট লাইব্রেরি থাকবে। ছুটির দিনে একা কোথাও চলে যাবে। সঙ্গে থাকবে একটা স্কেচবুক। বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস সবকিছুই ঠিক ছিল।
তারপর একদিন অভিক বলেছিল,
“এখন চাকরিটা না করলেও চলে। পরে কোরো।”
কয়েক দিন পর বন্ধুরা বেড়াতে ডাকল।
“এই সপ্তাহে না গেলেই হয়।” নিশি আর বিষয়টা বাড়াল না।
এরপর একদিন রঙতুলিগুলো আলমারির ভেতর চলে গেল। বইয়ের পাতায় ধুলো জমতে লাগল। চাকরির ফর্মগুলো ড্রয়ারের নিচে পড়ে রইল। কেউ তাকে থামায়নি। তবু একসময় থেমে গিয়েছিল।
একদিন আলমারির নিচে রঙতুলিগুলো দেখে নিশির মনে হলো, অনেক দিন এগুলো ছোঁয়া হয়নি। কবে তুলে রেখেছিল, সেটাও আর মনে নেই। বিচ্ছেদের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ কিছুই ভালো লাগত না। ঘুম ভাঙত দেরিতে। চা বানিয়ে রেখে দিত। ঠান্ডা হয়ে যেত। মোবাইল বেজে উঠলেও ধরতে ইচ্ছে করত না।
একদিন পুরোনো একটা বাক্স গুছাতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ডটা পেল। ছবিতে হাসিমুখের একটা মেয়ে। হাতে রঙতুলি। পেছনে বন্ধুদের ভিড়। নিশি অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“তুই কোথায় হারিয়ে গেলি?” ঘরটা চুপচাপ।
উত্তর এল না।
তবু সেদিনই সে বাইরে বের হলো। পাড়ার লাইব্রেরিতে গিয়ে সদস্য হলো। ফেরার পথে একটা ছোট্ট স্কেচবুক কিনল। রাতে প্রথম পাতায় আঁকতে বসে হাত থেমে গেল। রেখাটা একটু বেঁকে গেল।
নিজেই হেসে ফেলল।
“এত দিন পরে… হাত কাঁপবেই।”
পরের সপ্তাহে একটা স্কুলে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিল। চাকরি হবে কি না জানত না। তবু আবেদনপত্রটা জমা দিয়ে বের হওয়ার সময় বুকটা অদ্ভুত হালকা লাগছিল। অনেক দিন পর নিজের একটা সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছে।
কয়েক মাস পরে বাজারে অভিকের সঙ্গে দেখা। খুব সাধারণ কিছু কথা হলো।
বিদায় নেওয়ার আগে অভিক জিজ্ঞেস করল, “ভালো আছ?”
নিশি একটু ভেবে বলল, “শিখছি।”
অভিক মাথা নাড়ল। আর কিছু বলল না।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে নিশি আবার আয়নার সামনে দাঁড়াল। এবার মানুষটাকে অচেনা লাগল না। সবটা ফিরে আসেনি। তবু চোখের ভেতর আগের সেই ঝিলিকটা আবার দেখা যাচ্ছে।
ব্যাগ থেকে স্কেচবুকটা বের করল। প্রথম পাতায় নতুন কিছু লেখার বদলে আঁকতে শুরু করল। একটা টানা রেখা। তারপর আরেকটা। এবার হাত কাঁপল না।
খাতাটা আস্তে করে বন্ধ করে নিশি জানালার পাশে রেখে দিল। আজ আর নিজের জন্য কোনো উত্তর খুঁজতে হলো না। কারণ অনেক দিন পর তার মনে হলো, সে আর নিজেকে খুঁজছে না। ধীরে ধীরে নিজের কাছেই ফিরে আসছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।