মাইক্রো এনজিওগ্রাম: হৃদয়ের ভেতরের অদৃশ্য পথ
একজন হৃদরোগীর জবানবন্দি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
আত্মকথনধর্মী বিশ্লেষণ
| ১২ আগস্ট ২০২৬
মানুষ নিজের শরীরের ভেতর কী হচ্ছে, সেটা আসলে কতটুকুই বা জানে?
বাইরে থেকে আমাকে দেখে হয়তো বোঝার উপায় নেই, বুকের ভেতর কত বছরের একটা ভয় নিয়ে আমি বেঁচে আছি। হাঁটি, কথা বলি, কাজ করি, মানুষের সঙ্গে হাসি। সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হয়। অথচ বুকের সামান্য অস্বস্তি হলেই আমার পৃথিবীটা বদলে যায়। কারণ আমি জানি, এই বুক আমাকে একবার আগেও ভয় দেখিয়েছে।
আমার গল্পটা শুরু হয়েছিল অনেক বছর আগে। প্রথমে বুকের মধ্যে চাপা একটা ব্যথা। তারপর পরীক্ষা, রিপোর্ট, হাসপাতালের করিডোর আর চিকিৎসকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা।
একসময় হৃদযন্ত্রে স্টেন্ট (রিং) বসানো হলো। সেদিন মনে হয়েছিল, এবার বুঝি সব ঠিক হয়ে যাবে। আবার আগের জীবনে ফিরে যাব। হাসপাতাল, রিপোর্ট আর মৃত্যুভয়ের এই দৌড়ঝাঁপ হয়তো এখানেই শেষ।
কিন্তু জীবন সবসময় আমাদের ইচ্ছেমতো চলে না।
বছরের পর বছর চিকিৎসা চলেছে। ওষুধ খেয়েছি, পরীক্ষা করিয়েছি। কখনো কোনো রিপোর্ট দেখে স্বস্তি পেয়েছি, আবার কোনো রিপোর্ট সেই স্বস্তিটুকু কেড়ে নিয়েছে। একসময় জানতে পারলাম, হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে একাধিক সমস্যা হয়েছে। কোথাও রক্তনালি সরু হয়ে গেছে, কোথাও ব্লকেজ। ‘ব্লক’ শব্দটা তখন আর রিপোর্টের একটা শব্দ ছিল না। এটা হয়ে উঠেছিল ভয়।
এরপর একসময় বাইপাস সার্জারির টেবিলেও শুতে হলো। মনে হয়েছিল, এবার হয়তো যুদ্ধটা শেষ। কিন্তু পরে বুঝলাম, কিছু যুদ্ধ শেষ হয় না। মানুষ শুধু নতুন করে লড়তে শেখে।
কয়েক বছর পর আবার বুকের ভেতর সেই চেনা অস্বস্তি ফিরে এলো। আবার পরীক্ষা, আবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, আবার রিপোর্টের অপেক্ষা। মাথার ভেতর ঘুরতে থাকল সেই প্রশ্ন—“এখন কী করব?”
ঠিক তখনই আমার সামনে এলো একটা শব্দ—‘মাইক্রো এনজিওগ্রাম’।
এনজিওগ্রাম আমার কাছে নতুন নয়। নিজের শরীর দিয়েই তার অভিজ্ঞতা হয়েছে কয়েকবার । কিন্তু এই নামটা নতুন। তাই চিকিৎসকের কাছে বসে এবার চুপ করে থাকলাম না।
আমি জানতে চাইলাম, “আমার ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা কেন দরকার?”
চিকিৎসক আমাকে বুঝিয়ে বললেন, আমার মতো রোগীর ক্ষেত্রে শুধু বড় রক্তনালিতে ব্লক আছে কি না, সেটাই সবসময় পুরো সমস্যার উত্তর দেয় না। উপসর্গের সঙ্গে যদি বড় রক্তনালির পরীক্ষার ফল পুরোপুরি মিলে না যায়, তখন হৃদযন্ত্রের ক্ষুদ্র রক্তনালির কার্যকারিতা বা রক্তপ্রবাহের বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে। তবে আমার ক্ষেত্রে সত্যিই এমন কোনো পরীক্ষা প্রয়োজন কি না, সেটা আমার উপসর্গ, আগের রিপোর্ট ও সামগ্রিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে এতে নতুন কী জানা যাবে?”
তিনি বললেন, প্রয়োজন অনুযায়ী এমন কিছু তথ্য পাওয়া যেতে পারে, যা শুধু বড় রক্তনালির ছবি দেখলে বোঝা যায় না। বিশেষ করে রক্তপ্রবাহের সমস্যা কোথায় এবং কী ধরনের, সেটা চিকিৎসার পরবর্তী সিদ্ধান্তে সহায়ক হতে পারে।
আমার পরের প্রশ্ন ছিল, “আগের পরীক্ষায় যা জানা গেছে, তার বাইরে আর কী জানা সম্ভব?”
উত্তরটা আমাকে ভাবিয়ে দিয়েছিল। সব সমস্যা শুধু ‘ব্লক আছে কি নেই’—এই দুই শব্দে শেষ হয় না। বড় রক্তনালির অবস্থা জানা এক বিষয়, আর হৃদযন্ত্রের ক্ষুদ্র রক্তনালির কার্যকারিতা বা রক্তপ্রবাহ কেমন, সেটা বোঝা আরেক বিষয়। রোগীর উপসর্গ ও পরীক্ষার ফলের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে এই অতিরিক্ত তথ্য কখনো চিকিৎসকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
শেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা করলাম, “ফল পাওয়ার পর আমার চিকিৎসায় কী পরিবর্তন আসতে পারে?”
চিকিৎসক বললেন, পরীক্ষার ফল যদি এমন কোনো তথ্য দেয় যা বর্তমান সমস্যার কারণ বুঝতে সাহায্য করে, তাহলে ওষুধ, জীবনযাপন বা প্রয়োজনীয় পরবর্তী চিকিৎসা নিয়ে সিদ্ধান্ত আরও নির্দিষ্টভাবে নেওয়া যেতে পারে। আবার ফল যদি নতুন কিছু না দেখায়, তাহলেও অপ্রয়োজনীয় কোনো চিকিৎসা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্তে সাহায্য করতে পারে।
কথাগুলো শুনে বুঝলাম, কোনো পরীক্ষা করানোই আসল কথা নয়। আসল কথা হলো—পরীক্ষাটা কেন করছি এবং তার ফল দিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভয় অবশ্যই ছিল। এখনো আছে।
যে মানুষ স্টেন্টের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, বাইপাস সার্জারির পর হাসপাতালের বিছানায় চোখ খুলেছে, তার কাছে হাসপাতালের দরজা আর সাধারণ কোনো দরজা থাকে না। ওই দরজার সঙ্গে ব্যথা, অপেক্ষা, ভয় আর বেঁচে ফিরে আসার স্মৃতি জড়িয়ে থাকে।
হাসপাতালের ভেতরে বসে থাকলে বাইরের পৃথিবীটাকে খুব দূরের মনে হয়। কেউ অফিসে যাচ্ছে, কেউ সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ বন্ধুর সঙ্গে চা খাচ্ছে। আর আমি বসে আছি আমার নিজের হৃদযন্ত্রের খবরের অপেক্ষায়।
তখন পৃথিবীটা কয়েকটা শব্দে আটকে যায়—রক্তনালি, ব্লকেজ, রক্তপ্রবাহ, রিপোর্ট, চিকিৎসা। আর শেষে একটা প্রশ্ন—“আমি কি বাঁচব?”
এই প্রশ্নের উত্তর কোনো রিপোর্টে লেখা থাকে না। চিকিৎসক পথ দেখাতে পারেন, কিন্তু ভয়টার সঙ্গে লড়াইটা রোগীকেই করতে হয়।
আজ ‘মাইক্রো এনজিওগ্রাম’ কথাটা মনে হলে এটা আমার কাছে শুধু একটা পরীক্ষার নাম নয়। এটা আমাকে শিখিয়েছে, নিজের শরীর নিয়ে প্রশ্ন করতে হয়। ভয় পেলেও জানতে হয়। কোনো পরীক্ষা করার আগে বুঝতে হয়—কেন করছি, কী জানতে চাই এবং সেই তথ্য চিকিৎসায় কী কাজে লাগবে।
আমি জানি না সামনে আর কত পরীক্ষা আছে। জানি না আর কতবার হাসপাতালের সেই পরিচিত দরজা দিয়ে ঢুকতে হবে। কিন্তু এখনো থামতে চাই না।
আমি আরও কিছু সকাল দেখতে চাই। প্রিয় মানুষগুলোর মুখ আরেকবার দেখতে চাই। কিছু অসমাপ্ত কথা বলতে চাই। কিছু অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে চাই।
হয়তো বেঁচে থাকার ইচ্ছা আসলে খুব বড় কিছু নয়।
শুধু আরেকটু সময়।
আরেকটা সকাল।
আরেকবার প্রিয় মুখগুলো দেখা।
সামনে কী আছে জানি না। তবু ভয় নিয়েই চলছি।
কারণ সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়। ভয় পাওয়ার পরও পরের দিনটা শুরু করা।
হৃদয়ের ভেতরে যতদিন সেই ছোট্ট আশাটুকু আছে, ততদিন আমি দরজাটা খুলব।
ওপাশে কী আছে জানি না।
তবু খুলব।
কারণ আমি এখনো বাঁচতে চাই।
দ্রষ্টব্য: এই লেখা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির ভিত্তিতে লেখা। ‘মাইক্রো এনজিওগ্রাম’ শব্দটি চিকিৎসা-প্রেক্ষাপটভেদে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। কোনো পরীক্ষা আপনার জন্য প্রয়োজন কি না, পরীক্ষাটির সঠিক নাম কী এবং ফলাফল চিকিৎসার সিদ্ধান্তে কীভাবে কাজে লাগবে—এসব বিষয়ে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বা ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।