ভেতরের ঝড়, বাইরের ভাঙন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০৪, ২০২৬
বিকেলের আলোটা সেদিন নীলার চোখে অচেনা লাগছিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে নিচের রাস্তা দেখছিল। মানুষ যাচ্ছে, থামছে, কথা বলছে—সবই স্বাভাবিক। তবু তার ভেতরে একটা অস্থিরতা জমে ছিল, যার কারণ সে ধরতে পারছিল না।
সকাল থেকেই মনটা খিটখিটে। খুব ছোট একটা কথা থেকেই শুরু।
আরিফ বলেছিল,—“চা’টা একটু কম মিষ্টি হলে ভালো হতো।”
নীলা কিছু বলেনি। কাপটা চুলার পাশে নামিয়ে রেখে সেখান থেকেই সরে আসে। সেই মুহূর্তের পর আর কথা হয়নি।
এটা নতুন না। কয়েক মাস ধরেই এমন চলছে। কখনো হঠাৎ রাগ, কখনো অকারণে চুপ হয়ে যাওয়া, আবার কখনো এমনভাবে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া যেন কিছুই হয়নি।
মিথিলা দরজা পর্যন্ত আসে। থামে। চুলের ক্লিপটা খুলে আবার লাগায়, তারপর ধীরে সরে যায়। নীলা খেয়াল করে, কিন্তু কিছু বলে না।
সে বসে পড়ে। হঠাৎ মনে হয় বুকটা ভারী। চোখ ভিজে আসে, কিন্তু কান্নাটা শব্দ করে না।
মনে প্রশ্ন ওঠে—সে কি আগের মতোই আছে?
ফোনে একটা পুরোনো অডিও চালায়। ডাক্তারের কণ্ঠ—হরমোন, ঘুম, পুষ্টির কথা।
সে মাঝপথেই বন্ধ করে দেয়।
চায়ের কাপটা টেবিলে পড়ে আছে। ঠান্ডা হয়ে গেছে। কখন?
রাতে টেবিলে সবাই বসে। কেউ কথা শুরু করে না।
মিথিলা হঠাৎ বলে,—“মা, তুমি আগের মতো হাসো না কেন?”
নীলা তাকায়। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়—“আমি কি তোমাদের কষ্ট দিচ্ছি?”
আরিফ চামচ নামিয়ে রাখে।—“তুই নিজেও তো ঠিক নাই, নীলা।”
এরপর আর কিছু না।
সেদিনের পর থেকে বড় কোনো পরিবর্তন আসে না। দিনগুলো আগের মতোই চলতে থাকে, শুধু নীলা নিজের ভেতরের কিছু জিনিস খেয়াল করতে শুরু করে। খাওয়া-দাওয়া এলোমেলো—কখনো কিছু না খেয়ে থাকা, কখনো হঠাৎ বেশি খাওয়া। ঘুমও ঠিক নেই। রাত জেগে থাকা, সকালে ক্লান্ত শরীর।
আগে খেয়াল করেনি। এখন খণ্ড খণ্ড করে সব সামনে আসছে।
বিকেলে মিথিলাকে নিয়ে বের হয় সে। কাছেই হাঁটা।
—“মা, তুমি আজ ভালো আছো?” —“চেষ্টা করছি,” নীলা বলে।
পরের দিনগুলোতে কোনো বড় পরিবর্তন নেই। জীবন নিজের মতোই চলে, শুধু কিছু ছোট ছোট জিনিস বদলায়। সে খাওয়ার সময় একটু খেয়াল করে, রাতে ফোন দূরে রাখে, সকালে জানালার পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকে।
সব ঠিক হয়ে যায় না। কিন্তু এবার সে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার আগে একটু থামে।
এক রাতে সে আরিফের পাশে বসে বলে,—“মনে হয় আমি নিজেকেই ঠিকভাবে বুঝিনি এতদিন।”
আরিফ কোনো বড় কথা বলে না। শুধু মাথা নাড়ে।
দিনগুলো চলতে থাকে। মিথিলা আবার মায়ের পাশে বসে গল্প করে। হাসি পুরোপুরি ফিরে আসে না, কিন্তু দূরত্বটা কমে আসে।
একদিন সকালে নীলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে থাকে। কাজটা স্বাভাবিক, প্রতিদিনের মতোই। কিন্তু মাঝপথে হঠাৎ থেমে যায়। নিজের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
কোনো সিদ্ধান্ত না, কোনো বড় উপলব্ধি না—
শুধু একটা থামা। ছোট, কিন্তু স্পষ্ট।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।