মণ্ডপ থেকে জীবনে: দুর্গা পূজা নিয়ে ভাবনা
মন্ত্রের ভেতরের মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ১৮ অক্টোবর ২০২৬
দুর্গা পূজার মণ্ডপে দাঁড়ালে একটা জিনিস সবাই শোনে, কিন্তু খুব কম মানুষ তার মানে বোঝে।
মন্ত্র।
পুরোহিত সংস্কৃতে কিছু বলে যাচ্ছেন, আমরা হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ অঞ্জলির ফুল ছুড়ছে, কেউ চোখ বন্ধ করে আছে। শব্দগুলো কানে আসছে, কিন্তু মনে পৌঁছাচ্ছে কি?
আমরা অনেক সময় ভাবি মন্ত্র মানে দেবতাকে খুশি করার জন্য কিছু শব্দ। কিন্তু আসলে মন্ত্র মানে মনকে ত্রাণ করে যা, তাই মন্ত্র। মনকে এক জায়গায় আনে।
দুর্গা পূজার পাঁচটি খুব চেনা মন্ত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষরা দেবীকে শুধু পূজা করেননি, তাঁর মধ্যে মানুষের জীবনের সবচেয়ে জরুরি গুণগুলোকে খুঁজেছেন।
সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে: শুধু প্রণাম নয়, একটা স্বীকারোক্তি
মণ্ডপে সবচেয়ে বেশি যে মন্ত্রটি শোনা যায়, সেটি হলো প্রণাম মন্ত্র।
সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।
এর বাংলা খুব সহজ। হে নারায়ণী, তুমি সব মঙ্গলের মধ্যে মঙ্গল। তুমি সব চাওয়া পূরণ করো।
কিন্তু এখানে একটা শব্দ আছে - শরণ্যে। যিনি আশ্রয় দেন।
আমরা সাধারণত শক্তিশালী মানুষের কাছে আশ্রয় খুঁজি না, আমরা তার ক্ষমতাকে ভয় পাই। কিন্তু এই মন্ত্র বলছে, যে সবচেয়ে শক্তিশালী, সে-ই আশ্রয়দায়িনী। শক্তি আর আশ্রয় একসঙ্গে থাকতে পারে। এটাই তো পরিবারের বড় মানুষের হওয়া উচিত। বাবা বা মা শুধু শাসন করেন না, তাঁরা আশ্রয়ও দেন। এই মন্ত্র আসলে শক্তির একটা অন্য সংজ্ঞা শেখায়।
পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্রে কেন এতগুলো নাম?
অঞ্জলি দেওয়ার সময় পুরোহিত বলেন - জয়ন্তী, মঙ্গলা, কালী, ভদ্রকালী, কপালিনী, দুর্গা, শিবা, ক্ষমা, ধাত্রী।
একজনের এতগুলো নাম কেন?
কারণ একজন নারীকে এক জীবনে অনেক ভূমিকা পালন করতে হয়। কখনো সে জয়ন্তী, জয় এনে দেয়। কখনো সে ক্ষমা, ক্ষমা করে দেয়। কখনো সে ধাত্রী, ধারণ করে।
এই তালিকায় একটা নাম আমাকে সবসময় থামিয়ে দেয় - ক্ষমা।
যে দেবীর হাতে অস্ত্র, যে মহিষাসুরকে বধ করছেন, তাঁরই একটি নাম ক্ষমা। যে মারতে পারে, সে-ই ক্ষমা করতে পারে। যে ক্ষমা করতে পারে না, তার শক্তি আসলে অসম্পূর্ণ। আমাদের জীবনেও তো তাই। রাগের সময় অস্ত্র তুলে নেওয়া সহজ, ক্ষমা করে দেওয়া কঠিন। দুর্গা দুটোই পারেন। তাই তিনি দুর্গা।
আর শেষে বলা হয় - এষ সচন্দন পুষ্পাঞ্জলি। এই চন্দন মাখা ফুল তোমাকে দিলাম। এখানে ফুলটা আসল নয়, দেওয়াটা আসল। খালি হাতে কিছু দেওয়া যায় না, তাই ফুল একটা উপলক্ষ।
ধ্যান মন্ত্র: দেবীকে দেখার আগে নিজেকে দেখা
পূজা শুরুর আগে ধ্যান মন্ত্র পড়া হয়।
জটাজুট সমাযুক্তাম, অর্ধেন্দু কৃতশেখরাম।
মানে, যাঁর মাথায় জটার মুকুট, কপালে অর্ধচন্দ্র, তিনটি চোখ, মুখ পূর্ণ চাঁদের মতো।
এটা কি শুধু রূপের বর্ণনা? না।
জটা মানে তিনি সন্ন্যাসীর মতো ত্যাগী। আবার মুখ পূর্ণিমার চাঁদের মতো মানে তিনি সংসারের মতো সুন্দর। তিনি একসঙ্গে ত্যাগ ও সৌন্দর্য। আমাদের জীবনেও তো এই দুটোকে একসঙ্গে রাখতে হয়। শুধু সংসার করলে লোভ বাড়ে, শুধু ত্যাগ করলে জীবন শুকিয়ে যায়।
তিনটি চোখ মানে তিনি অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ তিনটাই দেখেন। আমরা সাধারণত শুধু বর্তমান দেখি। রাগের সময় অতীতের ভালো কথাগুলো ভুলে যাই, ভবিষ্যতের পরিণাম ভাবি না। তিন চোখের মানে হলো একটু দূর থেকে দেখতে শেখা।
বোধন আর বিসর্জন: আসা আর যাওয়াকে সম্মান করা
শরৎকালে দুর্গা পূজাকে অকালবোধন বলা হয়। অসময়ে জাগানো।
মন্ত্রে বলা হয় - অকালবোধনে দেবি শারদীয়ে নমো।
এখানে একটা সুন্দর শিক্ষা আছে। দেবীকে অসময়েও ডাকা যায়। মানে, ভালো কিছুর জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা করতে হয় না। যখন প্রয়োজন, তখনই ডাকতে হয়।
আর সবচেয়ে সুন্দর মন্ত্রটি হলো বিসর্জনের মন্ত্র।
গচ্ছ গচ্ছ পরং স্থানং।
তুমি তোমার জায়গায় যাও। আবার এক বছর পর এসো।
এটা বিদায়ের মন্ত্র, কিন্তু এতে কান্না নেই। আছে সম্মান। যাচ্ছো, যাও। আবার এসো। আমাদের জীবনে বিদায়গুলো আমরা এভাবে বলতে পারি না। কেউ চাকরি ছেড়ে গেলে, কেউ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে গেলে, আমরা হয় রাগ করি, নয় কষ্ট পাই। কিন্তু সম্মান দিয়ে বিদায় দিতে শিখি না। দুর্গা পূজা প্রতিবছর আমাদের সম্মান দিয়ে বিদায় দিতে শেখায়।
প্রতিমা নদীতে মিলিয়ে যায়, কিন্তু এই যাওয়ার মধ্যে একটা ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি থাকে।
তাই মন্ত্রগুলো শুধু সংস্কৃত শব্দ নয়। এগুলো জীবনের ছোট ছোট নির্দেশ।
শক্তিশালী হয়েও আশ্রয়দায়িনী হতে শেখা, অস্ত্র হাতে নিয়েও ক্ষমা নামটা মনে রাখা, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ তিনটাই দেখতে শেখা, আর যাওয়ার সময় সম্মান দিয়ে বিদায় দিতে শেখা।
হয়তো এই কারণেই হাজার বছর পরও মন্ত্রগুলো টিকে আছে। কারণ শব্দ বদলায়, ভাষা বদলায়, কিন্তু মানুষের এই প্রয়োজনগুলো বদলায় না।
মণ্ডপের আলো নিভে যাবে, ঢাক থেমে যাবে। কিন্তু এই কথাগুলো যদি মনে থেকে যায়, তাহলে পূজাটা শুধু মণ্ডপে শেষ হবে না, জীবনেও কিছুটা থেকে যাবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।