সবচেয়ে দামি জয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ১৮ জুন,২০২৬
ডিভোর্সের কাগজে সই করার সময় অভিকের মুখ দেখে কিছু বোঝার উপায় ছিল না।
টেবিলের ওপাশে নিশি বসে ছিল। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। গত কয়েক মাসের টানাপোড়েনে দুজনেই বদলে গেছে।
অভিক সই করে কলমটা নামিয়ে রাখল।
নিশির আঙুলগুলো ফাইলের কোণা চেপে ধরে ছিল। নখের পাশে কালি লেগে আছে।
“অভিক...”
সে থামল।
“আমি আসলে...”
কথাটা শেষ করল না।
অভিক চোয়াল শক্ত করল।
“থাক।”
নিশি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“ভালো থেকো।”
অভিক কোনো উত্তর দিল না।
আদালত থেকে বের হয়ে প্রথমবার বুক ভরে শ্বাস নিল সে।
মনে হলো, অনেকদিন পর চারপাশটা একটু হালকা লাগছে।
অভিক আর নিশির পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর প্রেম। বিয়েটাও হয়েছিল অনেক স্বপ্ন নিয়ে। প্রথম কয়েক বছর বেশ ভালোই কেটেছিল। শুক্রবারে হুটহাট কোথাও বেরিয়ে যাওয়া, রাতে সিনেমা দেখা, মাসের শেষে টাকা বাঁচিয়ে বিরিয়ানি খাওয়া—এসব ছোট ছোট ব্যাপারেই আনন্দ ছিল।
তারপর জীবন বদলাতে শুরু করল।
চাকরির চাপ বাড়ল।
দায়িত্ব বাড়ল।
ক্লান্তি বাড়ল।
এক রাতে অফিস থেকে ফিরতে অভিকের অনেক দেরি হয়েছিল। দরজা খুলেই নিশি বলল,
“ফোনটা ধরছিলে না কেন?”
“অফিসে ছিলাম।”
“জানি। কিন্তু একটা মেসেজ দিতে পারতে।”
“প্রতিদিন কি রিপোর্ট দিতে হবে?”
কথাটা বলেই অভিক বুঝেছিল স্বরটা বেশি কড়া হয়ে গেছে। কিন্তু তখন আর কিছু বলেনি।
তবে সব দোষ অভিকেরও ছিল না।
নিশির একটা স্বভাব ছিল। রাগ হলে সে চুপ হয়ে যেত। কখনো কখনো দুই-তিন দিন পর্যন্ত।
একবার ঝগড়ার পর অভিক কয়েকবার ফোন করেছিল। নিশি ধরেনি। রাতে একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল—
“যখন তোমার সময় হবে, তখন কথা বলো।”
অভিক মেসেজটা পড়েছিল। উত্তর দেয়নি।
কারণ তখন তারও মনে হয়েছিল, সবসময় তাকেই কেন আগে এগোতে হবে?
আরেকবার অভিকের মা কয়েকদিনের জন্য তাদের বাসায় এসেছিলেন। কোনো একটা ছোট বিষয় নিয়ে নিশি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল।
“সবসময় আমাকেই কেন মানিয়ে নিতে হবে?”
কথাটা বলার পরই সে বুঝেছিল, অভিক কষ্ট পেয়েছে।
পরে নিশি ক্ষমা চেয়েছিল। কিন্তু কিছু কথা ক্ষমার পরও মনে থেকে যায়।
এভাবেই ছোট ছোট অভিমান জমতে জমতে একসময় দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়।
এক রাতে নিশি বলেছিল,
“তুমি এখন আর কিছু শেয়ার করো না আমার সঙ্গে।”
অভিক ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলেছিল,
“সবকিছু শেয়ার করার বয়স কি আমাদের আছে?”
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
“আমি তোমার অফিসের হিসাব জানতে চাই না।”
সে একটু থেমে বলেছিল,
“শুধু জানতে চাই তুমি কেমন আছ।”
অভিক উত্তর দেয়নি।
আজ মনে হয়, সেদিন হয়তো নিশি ঝগড়া করতে আসেনি। কথা বলতে এসেছিল।
শেষের দিকে এসে দুজনের মধ্যে অদ্ভুত এক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। একই ঘরে থেকেও তারা যেন আলাদা জীবনে চলে গিয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদ হলো।
প্রথম কয়েক মাস অভিক নিজেকে বোঝাল, ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। বন্ধুদেরও সেটাই বলত। কাজে ডুবে থাকত। নতুন রুটিন বানাত।
কিন্তু রাতের নীরবতা মানুষকে এমন কিছু প্রশ্ন শোনায়, যেগুলো দিনের ব্যস্ততা ঢেকে রাখতে পারে না।
এক রাতে ফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে নিশির নম্বর সামনে চলে এল।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর কল দিল।
একবার রিং হলো।
দুইবার।
তিনবার।
অভিক নিজেই কল কেটে দিল।
আরেকদিন আলমারি গোছাতে গিয়ে একটা ছোট কাগজ পেল।
নিশির হাতের লেখা।
“রাত ১১টায় ওষুধ খেতে ভুলবে না।”
কাগজটা ফেলে দিতে গিয়েও পারল না।
ড্রয়ারে রেখে দিল।
সময়ের সঙ্গে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে—একসময় সে সত্যিই বিশ্বাস করত।
কিন্তু সবকিছু ঠিক হয়নি।
এক সহকর্মীর সঙ্গে কয়েক মাস নিয়মিত কথা হয়েছিল তার। বন্ধুরা ভেবেছিল, হয়তো নতুন করে শুরু করবে।
একদিন মেয়েটি হেসে বলেছিল,
“তুমি এত চুপচাপ কেন?”
প্রশ্নটা শুনে হঠাৎ নিশির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল।
“তুমি এখন আর কিছু শেয়ার করো না আমার সঙ্গে।”
এরপর সম্পর্কটা আর এগোয়নি।
দুই বছর পর এক বন্ধুর বিয়েতে নিশির সঙ্গে দেখা হলো।
অনেক মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল সে।
আগের চেয়ে একটু শুকিয়ে গেছে।
তবে শান্ত লাগছিল।
চোখাচোখি হতেই নিশি এগিয়ে এল।
“কেমন আছ?”
“ভালো।”
“আন্টি কেমন আছেন?”
অভিক এক মুহূর্ত থামল।
“ভালো।”
“ভালো।”
কথা শেষ।
একসময় এই মানুষটার সঙ্গে রাত ভোর হয়ে যেত কথা বলতে বলতে। আজ দুজনের মধ্যে কয়েকটা বাক্যের বেশি কিছু নেই।
নিশি চলে যাওয়ার পর অভিক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, কিছু সম্পর্ক ভাঙে না একদিনে। ভাঙতে ভাঙতে একসময় এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে ফিরে যাওয়ার রাস্তা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
অনুষ্ঠান শেষে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল সে। নিচে শহরের আলো জ্বলছিল। দূরে গাড়ির শব্দ ভেসে আসছিল।
হঠাৎ আদালতের সেই দিনের কথা মনে পড়ল।
“আমি আসলে...”
নিশি বাকিটা শেষ করতে পারেনি।
সেও শুনতে চায়নি।
সেদিন আদালত থেকে বের হওয়ার সময় অভিক ভেবেছিল সে জিতে গেছে।
আজ এত বছর পরও সে জানে না, নিশি বাকিটা কী বলতে চেয়েছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।