শেষ পর্যন্ত কেউ জেতেনি
পর্ব–৮ : ক্ষমা চাইলেই কি সব ঠিক হয়ে যায়?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
"ক্ষমা চাওয়া সহজ। কিন্তু ভাঙা বিশ্বাস আবার গড়া সবচেয়ে কঠিন।"
অনেক দিন পর ফোনের স্ক্রিনে নামটা জ্বলে উঠল—নিশি।
প্রথমবার রিং হয়ে থেমে গেল। অভিক তাকিয়ে রইল। ধরল না।
দ্বিতীয়বার বাজতেই বুকের ভেতর পুরোনো অভ্যাসটা নড়ে উঠল। সে কলটা ধরল।
ওপাশে শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। কয়েক সেকেন্ড পর খুব নিচু গলায় ভেসে এল, “একটু দেখা করবে?”
অভিক চোখ বন্ধ করল। এই ফোনটা একদিন আসবেই, সে জানত।
“কাল বিকেলে এসো। মেয়েরা স্কুলে থাকবে।”
কোনো ‘ঠিক আছে’ না, ‘ধন্যবাদ’ না। লাইনটা কেটে গেল।
পরদিন বিকেল চারটা।
কলিংবেল বাজতেই দরজা খুলল অভিক।
সামনে দাঁড়িয়ে নিশি।
একসময়ের নিশি আর এই নিশির মধ্যে শুধু চেহারার মিল। শাড়িটা সেই পুরোনো, যেটা অভিকই কিনেছিল মেঘলার প্রথম জন্মদিনে। কিন্তু শাড়ির নিচের মানুষটা ক্ষয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি, গাল ভাঙা, ঠোঁট শুকনো। যে মেয়ে কাজল না দিয়ে বাইরে বের হতো না, সে আজ নিজের দিকেই তাকায় না বোঝা যায়।
“ভেতরে এসো।”
ড্রয়িংরুম। সেই সোফা, সেই টি-টেবিল, দেয়ালে মেয়েদের আঁকা ছবি। একসময় এখানে বসে তারা প্ল্যান করত—মেঘলাকে ডাক্তার বানাবে, মিশিকে আর্ট স্কুলে দেবে। আজ সেই ঘরটাই কাঠগড়া।
অভিক দুই কাপ চা এনে রাখল। ধোঁয়া উঠছে। কেউ ছুঁল না।
নীরবতা ভাঙল নিশি। গলাটা কাগজের মতো খসখসে।
“আমি জানি, আমার আসার কথা না। আমার কোনো মুখ নেই।”
অভিক জানালার বাইরে তাকাল। রোদ পড়ে আসছে।
“মুখের কথা না, নিশি। কী বলবে সেটা বলো।”
নিশি দুই হাত কোলের ওপর জড়ো করে রাখল। নখগুলো কাটা, রংচটা।
“আমি ভুল করেছি।”
তিনটা শব্দ। বলতে গিয়ে তার ঠোঁট কাঁপল। এতদিনের জমে থাকা পাথরটা মুখ দিয়ে বের করতে গেলে গলায় আটকে যায়।
অভিক চুপ। সে এই শব্দটার জন্য অপেক্ষা করেছে মাসের পর মাস। আজ শুনেও বুকের ভেতর কিছু বাজল না। শুধু একটা খালি ঘর।
“আরও আগে বলতে চেয়েছি। নম্বরটা ডায়াল করে কেটে দিয়েছি হাজারবার।”
“কেন?”
“ভয়। তুমি যদি বলো, ‘আর কোনোদিন ফোন দেবে না’। সেই ভয়টা সহ্য করতে পারতাম না।”
ঘরে বিকেলের আলো কমছে।
অভিক চেয়ারে হেলান দিল। “শুরুতে আমি তোমাকে ঘৃণা করতাম, নিশি। ভাবতাম সামনে পেলে চিৎকার করব। দেয়াল ভাঙব। তারপর একদিন সকালে মিশির টিফিন বানাতে গিয়ে বুঝলাম, ঘৃণা নিয়ে ডিম ভাজা যায় না। মেঘলাকে অঙ্ক বোঝানো যায় না। ঘৃণা একটা বিলাসিতা। আমার সেই বিলাসিতার সময় নেই। তাই ছেড়ে দিয়েছি।”
নিশির চোখে পানি টলমল করে উঠল। এক ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল কোলের ওপর।
“তার মানে... তুমি আমাকে মাফ করে দিয়েছ?”
অভিক মাথা ঝাঁকাল। মুখে হাসি ফুটল। সেই হাসিতে একসময় প্রেম ছিল। আজ শুধু শ্রান্তি।
“হ্যাঁ। মাফ করে দিয়েছি। নিজের জন্য। ঘৃণা বয়ে বেড়ালে আমি মরে যেতাম।”
নিশি শব্দ করে কেঁদে ফেলল এবার। এতদিনের বাঁধ ভাঙল।
কিন্তু অভিক হাত বাড়াল না। সান্ত্বনা দিল না। শুধু টেবিলের টিস্যু বক্সটা একটু এগিয়ে দিল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “কিন্তু নিশি, মাফ করা আর আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া এক না।”
নিশি টিস্যুতে মুখ চেপে ধরল।
“কাচ জোড়া লাগে। দাগটা থেকে যায়। আমরা এখন সেই দাগের দুই পাশে দাঁড়িয়ে। চাইলে দেখতে পাব, ছুঁতে পারব না।”
নিশি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “আমি যদি একটা দিন ফিরে পেতাম। শুধু একটা দিন। আমি সব বদলে দিতাম।”
“আমিও।” অভিক উঠে জানালার গ্রিল ধরল। “আমিও অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতাম। তোমার সাথে ছাদে চা খেতাম। ফোনটা রেখে তোমার গল্প শুনতাম। কিন্তু ‘যদি’ দিয়ে তো ঘর বাঁধা যায় না।”
“তুমি এখনো নিজেকে দোষ দিচ্ছ?” নিশি অবাক।
“না। আমি বাস্তবতা বুঝছি। একটা সংসার তাসের ঘর। অনেকগুলো তাস লাগে। হাওয়া দিলে পড়ে যায়। কিন্তু আগুনটা কে লাগিয়েছে, সেই দায় তো তাকেই নিতে হয়, নিশি। আমি হাওয়া হয়েছিলাম, মানছি। কিন্তু আগুনটা...”
কথাটা শেষ করল না অভিক। দরকার নেই।
নিশি মাথা নিচু করে ফেলল। “আমি জানি। এই দায় নিয়ে আমাকে মরতে হবে।”
ঠিক তখনই গেটে শব্দ। চাবির আওয়াজ।
দুজনই চমকে উঠল। আজ হাফ-ডে। ভুলে গিয়েছিল।
মিশি দৌড়ে ঢুকল। “বাবা!” তারপর মাকে দেখে থমকে গেল এক সেকেন্ড। পরের সেকেন্ডে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল। “মা! তুমি এসেছ! আজকে থাকবে তো? প্লিজ বলো থাকবে!”
নিশি মেয়েকে বুকে চেপে ধরে। চোখ বন্ধ করে গন্ধ নেয়। এই গন্ধটার জন্য সে রোজ মরে।
“না মা, আজকে যেতে হবে সোনা।”
মিশির মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল। “তুমি কেন রোজ চলে যাও? তুমি আমাদের ভালোবাসো না?”
প্রশ্নটা ছুরির মতো। নিশির বুক এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেল। সে উত্তর দিতে পারল না।
মেঘলা দরজায় দাঁড়িয়ে। স্কুলড্রেস পরা, কাঁধে ব্যাগ। সে দৌড়ে এল না। সে এখন আর বাচ্চা না। সে দেখে। সে বোঝে। সে বিচার করে।
সে ঘরে ঢুকে ব্যাগটা নামাল। তারপর সোজা বাবার চোখে তাকাল। মায়ের চোখে তাকাল।
তার গলাটা শান্ত, কিন্তু শীতল। বারো বছরের মেয়ের গলা না, যেন ত্রিশ বছরের কোনো মানুষের।
“তোমরা কি ঠিক করেছ? আবার একসাথে থাকবে? নাকি আমাদের সত্যিটা বলার সময় হয়েছে?”
ঘরে পিনপতন নীরবতা।
ফ্যান ঘুরছে। বাইরে একটা রিকশার বেল।
অভিক মেয়ের দিকে তাকাল। এই চোখে সে নিজের ভয় দেখতে পেল। এই মেয়ে আর কাউকে সহজে বিশ্বাস করবে না। কারণ তার প্রথম স্কুল—তার পরিবার—তাকে শিখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বাস ভাঙে।
নিশি মিশিকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মেঘলার দিকে হাত বাড়াল। মেঘলা পিছিয়ে গেল না, এগিয়েও এল না।
অভিক আর নিশি দুজন দুজনের দিকে তাকাল।
এই প্রশ্নটার উত্তর তাদের কাছে নেই।
কারণ ‘হ্যাঁ’ বললে মিথ্যে হবে। ‘না’ বললে মেয়ে দুটোর বুকের ভেতর যে আশার শেষ প্রদীপটা জ্বলছে, সেটা নিভে যাবে।
তারা বুঝল, সবচেয়ে কঠিন রায় আদালত দেয় না।
সবচেয়ে কঠিন রায় দেয় সন্তানের চোখ।
আর সেই রায়ের আপিল হয় না।
চলবে...
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।