বাসন্তীর একগুঁয়েমি ও জীবনের শেষ ঠিকানা
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ০৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
আমি বাসন্তীকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। শুধু দেখিনি—ভাঙতে দেখেছি। ভাঙা শব্দে নয়, ভাঙা চুপে। ভাঙা রাতে। ভাঙা চোখে।
বাসন্তী ছিল সুন্দরী, মেধাবী, প্রাণবন্ত।
যে মেয়েরা ঘরে ঢুকলে আলো পাওয়া যায়—সে ছিল তাদের একজন।
সবাই বলত, “ওর মতো মেয়ে পাওয়া সৌভাগ্য।”
কিন্তু সৌভাগ্যও কখনো কখনো নিজের হাতে আগুন জ্বালায়।
বিয়ের পর থেকে বাসন্তী নিজের ভেতরে একটা যুদ্ধ শুরু করল।
স্বামীর সঙ্গে নয়—
জীবনের সঙ্গে নয়—
সে যুদ্ধ করল নিজের ‘আমি’টা নিয়ে।
সে ভাবল, “আমি নুইনি—মানে আমি হারিনি।”
সে ভাবল, “আমার কথা মানেই শেষ কথা।”
কিন্তু কোনো সম্পর্কেই ‘শেষ কথা’ বলে কেউ শেষ পর্যন্ত থাকে না।
তার স্বামীটা কোনো নায়ক ছিল না।
সুপারহিরোও না।
সে ছিল একটা মানুষ—যার মাস গেলে বেতন যায়,
বেতন গেলে বাজার থামে,
তবু স্বপ্ন থামে না।
সে বাসন্তীর পড়াশোনায় শরীর ঢেলেছে, ঘুম ঢেলেছে,
নিজের বাবা–মাকে পিছনে রেখে
নিজের সংসারটা সামনে ধরেছে।
সে ভাবত, “একদিন আমার বাসন্তী বড় হবে।
আমি তখন চুপ করে হাসবো।”
কিন্তু বাসন্তী যত বড় হলো, তার সহনশীলতা তত ছোট হতে লাগল।
একসময় কথা বদলে গেল— “তুই পারিস না।”
“তোর মতো মানুষের পাশে আমি নষ্ট হচ্ছি।”
“আমার বান্ধবীর স্বামী এইটা করেছে—তুই কেন করিস না?”
একদিন গিয়ে “আমার স্বামী” শব্দটা হারিয়ে গেল।
তার জায়গায় এল—“ওই লোকটা।”
ভাষা বদলায় মানে—ভালোবাসা বদলায়।
বাসন্তীর বাবা–মা নীরব ছিলেন। নীরবতা কখনো শান্তির লক্ষণ না, অনেক সময় সেটা দুর্ঘটনার আগের নিস্তব্ধতা।
তারা কিছু বললেন না, আর একদিন তালাকের কাগজ এসে বলল—সব।
আজ বাসন্তীর ফ্ল্যাট বড়। দেয়ালে দামি ছবির ফ্রেম,
ঘরে দামী সোফা, কিন্তু কোনো শব্দ নেই।
ফেসবুকে সে হাসে। ক্যাপশনে লেখা থাকে—“Strong woman.”
কিন্তু রাত হলে, শক্ত মানুষও দুর্বল হয়ে পড়ে।
একদিন এক বেদুইন মা তার মেয়েকে বলেছিলেন—
“স্বামীর সামনে দাসী হও,
সে একদিন তোমার জন্য রাজা হবে।”
এই কথা দাসত্ব শেখায় না।
এটা শেখায় নম্রতার শক্তি।
বাসন্তী সেটা বুঝতে পারেনি।
সে রানী হতে চেয়েছিল।
আজ সে রানী—কিন্তু রাজ্য শূন্য।
এই গল্প কোনো মেয়ের বিরুদ্ধে না।
এই গল্প কোনো ছেলের পক্ষেও না।
এই গল্প অহংকার আর ভালোবাসার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মানুষের গল্প।
যে ভেবেছিল—“আমি নড়বো না।”
আর জীবন এসে বলেছে—“তবু ভাঙবে।”
সংসার কোনো যুদ্ধের ময়দান না।
এটা একটা বাগান।
দুজনেই না নুয়ে পড়লে, কোনো গাছে আর ফুল ফোটে না।
বাসন্তী,
তুই আজও আমার আপন।
যদি কোনোদিন এই লেখাটা তোর চোখে পড়ে,
একটা ফোন দিস।
আমি জানি—তুই কাঁদবি।
আর মানুষ যখন কাঁদে,
তখনই সে ফের মানুষ হয়ে ওঠে।
#বাসন্তীর_গল্প #অহংকার_আর_ভালোবাসা #সংসারের_সত্য #মানুষের_ভুল #ভেতরের_যুদ্ধ #সম্পর্কের_মনস্তত্ত্ব #তালাকের_বাস্তবতা #বাংলার_গল্প #EmotionalWritingBangla
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।