পূজা থেকে প্রয়োগে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
প্রবন্ধ। ২৮ অক্টোবর ২০২৬
লক্ষ্মীপূজার প্রস্তুতি চলছে একটি বাড়িতে। ঘর পরিষ্কার করা হয়েছে, পূজার উপকরণ সাজানো হচ্ছে। মা ব্যস্ত প্রসাদ তৈরিতে। বাবা নিজের ব্যবসার হিসাব নিয়ে বসেছেন। পাশের ঘরে ছেলে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত, বই খোলা থাকলেও পড়ায় মন নেই। অন্যদিকে, বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারীর কয়েক মাসের বেতন বকেয়া পড়ে আছে। বিষয়টি বাবা জানেন, কিন্তু টাকা দেওয়ার ব্যাপারে বারবার সময় নিচ্ছেন।
সন্ধ্যায় পূজা হলো। সবাই সম্পদ, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনা করলেন। পরদিন সকালে ছেলেটি আবার ফোন নিয়ে বসে পড়ল, আর বাবা কর্মচারীর বকেয়া বেতনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলেন। পূজা শেষ হয়েছে, কিন্তু কারও অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
এই দৃশ্য কোনো একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের আচরণের দূরত্ব কোথায়, তা বোঝার জন্য এমন একটি দৃশ্যই যথেষ্ট।
জ্ঞানের পূজা, শেখার অভাব
সরস্বতীকে আমরা বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী হিসেবে শ্রদ্ধা করি। শিক্ষার্থীরা বই-খাতা নিয়ে পূজা দেয়, ভালো ফলের প্রত্যাশা করে। কিন্তু জ্ঞান অর্জনের জন্য শুধু প্রার্থনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত পড়াশোনা, মনোযোগ, ভালো শিক্ষার পরিবেশ এবং ভুল থেকে শেখার মানসিকতা।
একটি শিশু যখন দেখে, তার বাবা-মা সারাক্ষণ মুঠোফোনে ব্যস্ত, তখন শুধু তাকে বই পড়তে বললে খুব বেশি লাভ হয় না। শিশুরা উপদেশের চেয়ে বড়দের আচরণ থেকে বেশি শেখে। তাই সরস্বতীপূজার প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে পরিবারে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেওয়া এবং মুখস্থবিদ্যার বদলে বিষয় বুঝে শেখার সুযোগ তৈরি করা।
শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতায় পারিবারিক পরিবেশ ও অভিভাবকের সম্পৃক্ততার গুরুত্ব নিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার ২০২২ সালের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচির প্রতিবেদনেও আলোচনা রয়েছে (অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা, ২০২৩)।
সম্পদের প্রার্থনা, কাজে অসংগতি
লক্ষ্মীপূজায় মানুষ সম্পদ, সচ্ছলতা ও সমৃদ্ধি কামনা করে। কিন্তু সম্পদ অর্জন এবং তা ধরে রাখার জন্য দরকার দক্ষতা, পরিকল্পনা, পরিশ্রম, সততা ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। শুধু প্রার্থনা করলেই ব্যবসা সফল হয় না, কৃষকের ফসল ভালো হয় না কিংবা একজন কর্মজীবীর আয় বাড়ে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি, চীনের উৎপাদনশিল্পের বিস্তার এবং জার্মানির প্রকৌশল খাতের সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা, দক্ষ জনশক্তি ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান। এসব অর্জনকে শুধু কোনো জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। জার্মানির অর্থনৈতিক নীতিসংক্রান্ত নথিতেও গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে (জার্মানির অর্থনীতি ও জলবায়ু সুরক্ষা বিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রণালয়)।
আমাদের চারপাশেও এমন মানুষ আছেন, যাঁরা পূজায় সম্পদ বৃদ্ধির প্রার্থনা করেন, অথচ কর্মচারীর ন্যায্য বেতন আটকে রাখেন। কেউ ব্যবসায় সততার কথা বলেন, কিন্তু সুযোগ পেলে ক্রেতাকে ঠকান। কেউ অর্থের অভাব নিয়ে অভিযোগ করেন, অথচ অপ্রয়োজনীয় খরচ নিয়ন্ত্রণে আনেন না।
সম্পদ শুধু অর্থের পরিমাণ নয়; সম্পদ ব্যবহারের নৈতিকতাও এর অংশ। উপার্জন যদি অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে হয়, তাহলে সেই সমৃদ্ধির ভেতরে অন্যায় জমতে থাকে। লক্ষ্মীপূজার তাৎপর্য তখনই জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়, যখন মানুষ উপার্জনের পাশাপাশি ন্যায্যতা, সঞ্চয় ও দায়িত্বশীলতার চর্চা করে।
শক্তির আরাধনা, দায়িত্বে পিছিয়ে থাকা
দুর্গার আরাধনায় আমরা শক্তির প্রতীক দেখি। রামের জীবনে কর্তব্য ও সংযমের শিক্ষা খুঁজি, কৃষ্ণের কথায় প্রজ্ঞা ও কর্মের তাৎপর্য পাই। কিন্তু বাস্তব জীবনে অন্যায় দেখেও অনেক সময় আমরা নীরব থাকি। পরিবারের কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে তাঁকেই মানিয়ে নিতে বলা হয়। কর্মক্ষেত্রে দুর্বল কেউ অপমানিত হলে অনেকে নিজের স্বার্থে মুখ বন্ধ রাখেন।
শক্তি মানে শুধু প্রভাব বা ক্ষমতা নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, বিপদে থাকা মানুষের পাশে থাকা এবং নিজের সুবিধার বাইরে গিয়ে সঠিক কাজটি করার সাহসও শক্তির পরিচয়।
প্রকৃতির ক্ষেত্রেও আমাদের আচরণে একই অসংগতি দেখা যায়। নদীকে মা বলে শ্রদ্ধা করি, অথচ নদীতে বর্জ্য ফেলি। উৎসবের সময় প্রকৃতির মঙ্গল কামনা করি, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে পরিবেশের ক্ষতি করে এমন অভ্যাস বদলাতে চাই না। নদীদূষণ ঠেকাতে শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়; শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আইন কার্যকর করাও জরুরি।
প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই শ্রদ্ধা আমাদের কাজের মধ্যে প্রকাশ পায়।
পরিবর্তন শুরু হোক ছোট কাজে
পরিবর্তনের জন্য সব সময় বড় কোনো উদ্যোগের দরকার হয় না। প্রয়োজন বিশ্বাসের সঙ্গে আচরণের যোগ তৈরি করা।
সরস্বতীপূজার পর একটি পরিবার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, রাত নয়টার পর সবাই মুঠোফোন এক পাশে রেখে অন্তত বিশ মিনিট বই পড়বে। বাবা-মা নিজেরাও সেই অভ্যাসে অংশ নেবেন। শিশুকে শুধু পড়ার নির্দেশ না দিয়ে তাঁরা নিজেদের আচরণ দিয়ে পড়াশোনার গুরুত্ব বোঝাবেন।
লক্ষ্মীপূজার পর একজন ব্যবসায়ী তাঁর হিসাবের খাতা খুলে কর্মচারীদের বকেয়া বেতন নির্ধারণ করতে পারেন। একসঙ্গে সব টাকা দেওয়া সম্ভব না হলে তিনি নির্দিষ্ট সময়সূচি তৈরি করে কর্মচারীদের জানাতে পারেন। এতে প্রার্থনার পাশাপাশি অন্য মানুষের অধিকার রক্ষার বাস্তব উদ্যোগও নেওয়া হবে।
দুর্গাপূজার পর কেউ অন্যায়ের শিকার হলে শুধু দুঃখ প্রকাশ না করে তাঁর পাশে দাঁড়ানো যায়। আর নদী বা পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে নিজের বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং দূষণের ঘটনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো দিয়ে শুরু করা যায়।
এসব কাজ হয়তো এক দিনে সমাজ বদলে দেবে না। কিন্তু ছোট কাজের ধারাবাহিকতাই ব্যক্তিগত অভ্যাস ও সামাজিক আচরণে পরিবর্তন আনে।
পূজার পরদিন
লক্ষ্মীপূজার সেই বাড়িটিতে আবার ফিরে আসা যাক। পূজার পরদিন সকালে ছেলেটি বই খুলে বসেছে। বাবা কর্মচারীর বকেয়া বেতনের হিসাব করছেন এবং টাকা দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট দিন ঠিক করছেন। পরিবারের সমস্যাগুলো এক সকালে শেষ হয়ে যায়নি। তবু সেদিন প্রার্থনার সঙ্গে কাজের একটি যোগ তৈরি হয়েছে।
ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে শান্তি, আশা ও সাহস দিতে পারে। সেই বিশ্বাসকে অর্থবহ করার জন্য বিশ্বাস ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই; বরং বিশ্বাস থেকে পাওয়া মূল্যবোধকে জীবনে প্রয়োগ করা জরুরি।
আমরা জ্ঞানের পূজা করি, তাই শেখার পরিবেশ তৈরি করি। সম্পদের প্রার্থনা করি, তাই উপার্জনে সততা ও বণ্টনে ন্যায্যতা বজায় রাখি। শক্তির আরাধনা করি, তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ব পালন করি।
পূজার দিনে আমরা কী প্রার্থনা করেছি, তার পাশাপাশি পূজার পরদিন আমরা কী বদলেছি—প্রশ্নটা সেখানেই।
তথ্যসূত্র
১. অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা। (২০২৩)। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচি ২০২২: ফলাফল, পঞ্চম খণ্ড—শেখার কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গি।
২. জার্মানির অর্থনীতি ও জলবায়ু সুরক্ষা বিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রণালয়। উদ্ভাবননীতি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।