নিশি উপাখ্যান সিরিজ
গল্প-৭
অপরাধবোধের শিকল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৯ জুন, ২০২৬
বিচ্ছেদের কাগজে সই করার আগের রাতেও নিশির ঘুম আসেনি। বারবার মনে হচ্ছিল, সে কি খুব স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে?
অভিক কোনো দিন তাকে বলেনি,
“কোথাও যেতে পারবে না।”
ওর কথা বলার ধরনটাই আলাদা ছিল। “যাও।
আমি তো আটকাচ্ছি না।”
তারপর একটু চুপ।
“শুধু ভাবছি, এই দুটো দিন একা থাকব কীভাবে।” ব্যস। এরপর আর কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা থাকত না নিশির।
প্রথম প্রথম এসব শুনে তার ভালোই লাগত। মনে হতো, কেউ তাকে এতটা আপন ভাবছে। ধীরে ধীরে খেয়াল করল, নিজের অনেক সিদ্ধান্তই আর নিজের থাকে না। বান্ধবীদের সঙ্গে বেড়ানো বাদ। বাবার বাড়ি যাওয়া পিছিয়ে দেওয়া। চাকরির আবেদনটা পরে করা। কেউ জোর করেনি। তবু একটার পর একটা কাজ আর করা হয়নি।
একদিন চাকরির কথা তুলতেই অভিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তোমার ইচ্ছা। তবে চাকরি করলে তুমি খুব ব্যস্ত হয়ে যাবে। আমার সঙ্গে বসে গল্প করার সময়ই পাবে না।” নিশি আর কথাটা বাড়াল না। সেটাও থেকে গেল।
আরেকদিন বলল, মায়ের কাছে যাবে। অভিক হেসে বলল, “যাও।
শুধু ফিরে এসে যদি দেখো আমি ঠিকমতো খাইনি, তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিও না।”
কথাটা বলেই টিভির দিকে তাকাল। যেন খুব স্বাভাবিক একটা কথা। কিন্তু নিশির বুকের ভেতর কোথাও একটা ছোট্ট পাথর জমে রইল।
একদিন রিমি বলল,
“তুই সব সময় এমন ভাবিস কেন, সবাইকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তোর?”
নিশি হেসে উড়িয়ে দিল। কিন্তু রাতে ঘুম এল না। ডায়েরির পেছনে একটা কাগজে হিসাব করতে গিয়ে সে থেমে গেল। গত এক বছরে নিজের কতগুলো পরিকল্পনা সে নিজেই বাতিল করেছে?
প্রায় সব কটার পাশেই যেন একই কারণ।
"অভিক কষ্ট পাবে।"
কয়েক দিন পর একটা স্কুল থেকে ইন্টারভিউয়ের ডাক এল। এবার কাউকে কিছু না বলেই গেল। ফিরে এসে খবরটা দিতেই অভিক চুপ করে রইল। অনেকক্ষণ পর বলল,
“চাকরিটা পেলে তো আমাকে আর দরকার হবে না।” আগে হলে নিশি হয়তো তাড়াতাড়ি বলত,
“না না, তুমি এমন ভাবছ কেন?”
সেদিন বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“আমার নিজের জীবন শুরু হলে তোমাকে হারিয়ে ফেলব, এটা কেন মনে হয় তোমার?”
অভিক উত্তর দিল না। কয়েক দিন দুজনের মধ্যে কথাবার্তা কমই হলো। এক সন্ধ্যায় অভিক নিজেই বলল,
“আমি শুধু চাইনি তুমি আমাকে ছেড়ে যাও।”
নিশি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলল, “কাউকে পাশে রাখতে চাইলে তার হাত ধরতে হয়। এমনভাবে ধরে রাখা না, যাতে সে ছাড়তে গেলেই নিজেকে দোষী মনে করে।”
ঘরটা চুপ হয়ে গেল। কেউ আর কিছু বলল না।
তারপরের দিনগুলো সহজ ছিল না। কোথাও বেরোতে গেলেই বুকের ভেতর একটা অপরাধবোধ উঠত। মায়ের বাড়িতে গিয়েও মনে হতো, অভিক ঠিকমতো খেয়েছে তো?
বন্ধুদের সঙ্গে বসেও মনে হতো, ও একা আছে। তারপর একদিন হঠাৎ খেয়াল করল—এই ভাবনাগুলো একটু একটু করে কমে যাচ্ছে। কেউ অসহায় হলেই তাকে বাঁচিয়ে তোলার দায়িত্ব তার একার নয়।
এক বিকেলে রিমি জিজ্ঞেস করল,
“এখন কেমন আছিস?”
নিশি একটু হেসে বলল,
“আগে ভাবতাম, আমি না থাকলে মানুষ ভেঙে পড়ে। এখন বুঝি, কেউ যদি নিজের পুরো জীবনটা আমার কাঁধে তুলে দেয়, সেটাকে ভালোবাসা বলে না।”
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল সে। হাওয়াটা আগের মতোই ছিল। শুধু বুকের ভেতরটা অনেক হালকা লাগছিল। সেদিন তার মনে হলো, সব শিকল চোখে দেখা যায় না। কিছু শিকল শুধু একটা বাক্যের ভেতর লুকিয়ে থাকে।
"তুমি না থাকলে আমি শেষ।"
শুনতে খুব ভালোবাসার মতো লাগে। কিন্তু অনেক সময়, সেই কথাটাই মানুষকে নিজের জীবন থেকে সবচেয়ে দূরে নিয়ে যায়।
আপনার মতে, অপরাধবোধ দিয়ে কাউকে ধরে রাখা কি কখনো ভালোবাসা হতে পারে?
মন্তব্যে জানান।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।