নিশি উপাখ্যান সিরিজ
গল্প-৬
বন্ধ দরজার মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৯ জুন,২০২৬
পাড়ায় অভিকের খুব নামডাক। কারও রক্ত লাগলে সবার আগে হাসপাতালে ছুটে যায়। ঈদের আগে চুপচাপ কয়েকটা পরিবারে বাজার পৌঁছে দেয়। রাস্তায় বয়স্ক কাউকে দেখলে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। লোকজন প্রায়ই বলত,
“এমন ভদ্র ছেলে আজকাল ক'জন আছে?”
নিশি এসব শুনে হাসত। খুব ছোট্ট একটা হাসি। যেটা চোখ পর্যন্ত পৌঁছাত না। দরজা বন্ধ হলেই মানুষটা অন্য রকম হয়ে যেত। চিৎকার করত না। গালিও দিত না। তবু নিশির মনে হতো, ঘরের বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে।
“এতটুকু কাজও ঠিকমতো করতে পারো না?”
“তোমার সঙ্গে দুটো কথা বললেও মাথা ধরে যায়।”
“এসব বাইরে গিয়ে বলো না। মানুষ হাসবে।”
কথাগুলো বলেই অভিক টিভির রিমোট হাতে নিত। যেন কিছুই হয়নি। প্রথম প্রথম নিশি তর্ক করত। তারপর বোঝানোর চেষ্টা করত। একদিন খেয়াল করল, সেটাও আর করে না। সব কথা সবার জন্য হয় না।
এক বিকেলে রিমি এলো। অনেক দিন পর দেখা। গল্প করতে করতে হঠাৎ বলল,
“তুই আগের মতো হাসিস না কেন?”
নিশি কিছু বলার আগেই পাশের ঘর থেকে অভিক হেসে উঠল।
“আরে, ও এমনিতেই একটু চুপচাপ।”
রিমিও হেসে ফেলল। বিষয়টা সেখানেই শেষ। নিশি বুঝল, সত্যি কথারও কখনো কখনো কোনো সাক্ষী থাকে না।
কয়েক সপ্তাহ পর একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে সবাই অভিকের প্রশংসা করছিল।
“ভাগ্য করে এমন স্বামী পেয়েছ।”
নিশি শুধু মাথা নাড়ল। তার মনে হচ্ছিল, এই ঘরে যদি সে সত্যিটা বলেও ফেলে, কেউ বিশ্বাস করবে না। সবাই মানুষটার ব্যবহার দেখেছে। দরজা বন্ধ হওয়ার পরের মানুষটাকে কেউ দেখেনি।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে অভিক বলল, “আজ এত চুপচাপ ছিলে কেন?” “এমনি।”
“মানুষ কী ভাববে? মনে হবে আমি তোমার খেয়াল রাখি না।”
নিশি উত্তর দিল না। বিছানার পাশে রাখা ডায়েরিটা টেনে নিল। অনেক দিন পর একটা লাইন লিখল। “আজ বুঝলাম, মানুষ আমার মুখটা দেখে। আমার ভেতরটা না।”
কয়েক দিন পরে অভিকের অফিসের এক সহকর্মী বাড়িতে এল। চা-নাস্তা চলছিল। হঠাৎ রান্নাঘর থেকে একটা গ্লাস পড়ে ভেঙে গেল। অভিক উঠে গিয়ে খুব নিচু গলায় বলল,
“একটা গ্লাসও সাবধানে ধরতে পারো না?”
কথাটা আস্তে বলা হয়েছিল। তবু দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। সহকর্মী ফিরে এসে আর আগের মতো গল্প করল না। চা শেষ করেই উঠে গেল।
সেদিন প্রথমবার নিশির মনে হলো, সব কথা দেয়ালের ভেতর আটকে থাকে না। কিছু কথা দরজার ফাঁকও খুঁজে নেয়। তার কিছুদিন পর রিমি আবার এল। বিদায় নেওয়ার আগে আস্তে করে বলল,
“একটা কথা বলি?” “বল।”
“তোর বাসায় এলে আমার কেমন যেন দম বন্ধ লাগে।” নিশি কিছু বলল না। শুধু রিমির হাতটা একটু শক্ত করে ধরল।
কয়েক মাস পরে সে আলাদা হয়ে গেল। লোকজন অবাক হলো।
“এত ভালো মানুষকে ছেড়ে দিলে?”
“নিশ্চয়ই অন্য কিছু হয়েছে।”
নিশি কাউকে বোঝানোর চেষ্টা করল না। সব সত্যি সবার কাছে প্রমাণ করতে হয় না।
অনেক দিন পরে বাজারে অভিকের সঙ্গে দেখা। দুজনেই থামল। খুব সাধারণ কিছু কথা হলো। বিদায় নেওয়ার আগে অভিক বলল,
“সবাই আমাকে ভুল বুঝছে।”
নিশি একটু চুপ করে থেকে বলল, “না।” “তাহলে?” “মানুষ এখন শুধু সেই মানুষটাকে দেখছে, যাকে আমি এত দিন একা দেখেছি।”
অভিক আর কিছু বলল না।
সেদিন বাড়ি ফিরে নিশি সব জানালা খুলে দিল। ঘরে বাতাস ঢুকল। অনেক দিন পর তার মনে হলো, নীরবতারও একটা শব্দ আছে। সেটা ভয়ের নয়। মুক্তির।
আর কিছু মুখোশ… বন্ধ দরজার ওপাশে খুব বেশি দিন টেকে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।