সিরিজ-শব্দহীন পৃথিবীর গল্প
গল্প-১ আমাদের নীরব ঘর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২১ জুলাই, ২০২৬
আমাদের ঘরে প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় একইভাবে। চায়ের কাপের টুংটাং শব্দে, খবরের কাগজের খসখস আওয়াজে। এই চেনা শব্দের ভিড়ে একজন মানুষ একেবারেই আলাদা, আমাদের আট বছরের ছেলে আয়ান।
সকাল হলেই ও গিয়ে দাঁড়ায় বারান্দার গ্রিলের পাশে। গ্রিল গলে নরম রোদ এসে ওর মুখে পড়ে। ও নড়ে না, চোখ সরায় না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রোদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো তাড়া নেই, কোনো অস্থিরতা নেই।
আয়ান কথা বলে না। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত ওর মুখ থেকে একটা শব্দও আমরা শুনিনি। ডাক্তার, পরীক্ষা, থেরাপি, কোথায় না ছুটেছি আমরা। শেষমেশ সত্যটা মেনে নিতে হয়েছে, আয়ান অটিস্টিক। ও কথা বলবে না।
আর তখন থেকেই আমাদের মনে একটা সংশয় দানা বেঁধেছিল। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর কথায় সেই সংশয় আরও ভারী হতো। আয়ান কি আমাদের কথা বোঝে? ও কি ভালোবাসা বোঝে, কষ্ট বোঝে? নাকি ও নিজের ভেতরের কোনো দূর দেশে একা আটকে আছে, কাঠের পুতুলের মতো?
রাতের পর রাত এই ভাবনাটা ঘুম কেড়ে নিত। আয়ানের বাবা মারুফ জানালার দিকে তাকিয়ে জেগে থাকত। ওর একটাই কষ্ট, ছেলেটা কোনোদিন আমাদের 'বাবা' বা 'মা' বলে ডাকবে না? কোনোদিন কিছু চাইবে না?
আমাদের বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এই ভুল ধারণাটা এক বিকেলেই ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল।
তখন বর্ষার শেষ। আকাশ মেঘলা, টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। আমাদের পোষা বিড়াল মিনি দুই দিন ধরে খুব অসুস্থ। কিছুই খাচ্ছে না। ড্রয়িংরুমের সোফার নিচে অন্ধকার কোণে গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে। সকালে পশু চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে, ওষুধও দিয়েছে। কিন্তু মিনির চোখ দুটো নিভে আসছিল। বাঁচার কোনো ইচ্ছাই যেন ওর ভেতরে অবশিষ্ট নেই। আমি বারবার একটা বাটিতে একটু দুধ নিয়ে ওর মুখের সামনে ধরছিলাম। ও মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল।
আমরা সবাই ধরে নিয়েছিলাম, মিনিকে আর বাঁচানো যাবে না। ঘরজুড়ে একটা থমথমে শোক নেমে এসেছিল।
ঠিক তখনই আয়ান ধীর পায়ে করিডোর পেরিয়ে ড্রয়িংরুমে এল।
ওর পায়ে কোনো শব্দ ছিল না। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, ও না বুঝে মিনিকে টেনে বের করবে, ব্যথা দেবে। আমি ওকে থামাতে যাচ্ছিলাম। মারুফ আমার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, "থাক, দেখি ও কী করে।"
আয়ান সোফার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। আমরা সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছি।
ও কোনো শব্দ করল না। কোনো তাড়াহুড়ো করল না। খুব স্বাভাবিকভাবে ওর ছোট দুটো হাত বাড়িয়ে দিল সোফার নিচে, সেই অন্ধকার কোণের দিকে।
ওর নরম হাত দুটো গিয়ে পড়ল মিনির পিঠে আর পেটের ওপর। আলতো করে ছুঁয়ে দিল। তারপর মুখটা নিচু করে একদম সোজা তাকাল মিনির চোখের দিকে।
বিশ্বাস করুন, আমি কোনো গল্প বানাচ্ছি না। ওই মুহূর্তে ঘরের বাতাসটাই যেন বদলে গেল। আয়ান পলক না ফেলে, একটুও না নড়ে তাকিয়ে রইল মিনির চোখের গভীরে। ওদের মধ্যে কোনো কথা ছিল না, কোনো ডাকাডাকি ছিল না। তবু মনে হচ্ছিল, দুটো নীরব প্রাণ তাদের ভেতরের সমস্ত যন্ত্রণা, একাকিত্ব আর কষ্ট একটা অদৃশ্য ভাষায় একে অন্যকে বুঝিয়ে দিচ্ছে।
আয়ানের আঙুলগুলো আস্তে আস্তে মিনির কানের পেছনে বিলি কাটতে লাগল।
আর তখনই অলৌকিক ঘটনাটা ঘটল। পাঁচ মিনিট আগেও যে বিড়ালটা মরার মতো পড়ে ছিল, সে কেঁপে উঠে ক্ষীণ একটা শব্দ করল। তারপর ধীরে ধীরে দুর্বল শরীরটা টেনে সোফার নিচ থেকে মাথাটা বের করে আনল। আয়ানের হাতের তালুতে নিজের মুখটা ঘষতে লাগল।
আয়ান ওর থুতনির নিচে আঙুল বুলিয়ে দিতেই মিনি হেলেদুলে উঠে দাঁড়াল। গিয়ে আমার রেখে দেওয়া দুধের বাটিতে মুখ দিল।
আমরা ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা মানুষ একেবারে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। মারুফের চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছিল। আমার গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে আটকে ছিল।
আমরা এতদিন কত ভুল ভেবেছি। ভেবেছি, কথা বলতে না পারা মানেই ভেতরে কোনো অনুভূতি না থাকা। ভেবেছি, যে সন্তান আমাদের ভাষার ব্যাকরণ বোঝে না, সে পৃথিবীর কোনো আবেগই বোঝে না।
সেদিন চোখের সামনে থেকে পর্দাটা সরে গেল।
আমরা বুঝলাম, অটিস্টিক শিশুরা আমাদের মতো শব্দ দিয়ে নিজেদের সাজায় না ঠিকই, কিন্তু অনুভূতির যে গভীরে আমরা পৌঁছাতে পারি না, ওরা অনায়াসে সেখানে পৌঁছে যায়। আমরা যেখানে শব্দের জালে আটকে থেকে অন্যের চোখের ভাষা, মনের কষ্ট এড়িয়ে যাই, ওরা সেখানে এক পলকের দৃষ্টি আর একটুখানি ছোঁয়াতেই সব বুঝে নেয়। ওদের নীরবতার ভাষা আমাদের শেখানো ভাষার চেয়ে অনেক বেশি সত্যি, অনেক বেশি গভীর।
দুধটুকু শেষ করে মিনি এসে আয়ানের কোল ঘেঁষে বসল। আয়ান ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আমার দিকে তাকাল। ওর মুখে কোনো কথা ছিল না, কিন্তু ঠোঁটের কোণে লেগে ছিল এক চিলতে হালকা, স্নিগ্ধ হাসি।
ওই একটুখানি হাসির সামনে আমাদের বুকের ভেতর বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা সব ভয়, সব দুশ্চিন্তা, সব কষ্টের পাথর এক মুহূর্তে ধুলো হয়ে উড়ে গেল।
আমাদের নীরব ঘরের নীরব ছেলেটা কোনো কথা না বলেও সেদিন জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা শিখিয়ে দিল, ভালোবাসতে আর অন্যকে বুঝতে সবসময় মুখের শব্দ লাগে না, শুধু একটা খোলা হৃদয় লাগে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।