ফুটপাতের শৈশব
পর্ব ৩ — ঈদের দিনও যার নতুন জামা হয় না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৮ আগস্ট ২০২৬
ঈদের সকালে আমরা যখন নতুন জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াই, তখন একই শহরের কোনো এক ফুটপাতে একটা শিশু হয়তো তার পুরোনো জামাটাই ঝেড়ে গায়ে দেয়।
তার নতুন কিছু নেই।
তবু ঈদ তো ঈদ।
চারপাশে তখন অন্যরকম ব্যস্ততা। কারও ঘরে সেমাই রান্না হচ্ছে, কোথাও মাংসের গন্ধ। শিশুরা নতুন জামা পরে ছোটাছুটি করছে। কেউ বাবা-মায়ের হাত ধরে নামাজে যাচ্ছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার জন্য অধীর হয়ে আছে। মোবাইলের ক্যামেরায় একের পর এক ছবি উঠছে।
আর সেই একই শহরের অন্য কোথাও একটা শিশু হয়তো রাস্তার পাশে বসে মানুষের যাতায়াত দেখছে।
তার পরনে গত বছরের জামা। হয়তো জামাটার রং অনেক আগেই ফিকে হয়ে গেছে। কোথাও সেলাই, কোথাও ছেঁড়া। কিন্তু আজ সে এটাকেই একটু যত্ন করে পরে নিয়েছে।
হয়তো তারও মনে হয়েছে—আজ তো ঈদ।
নতুন জামা হলে ভালো লাগত।
পেট ভরে খেতে পারলে ভালো লাগত।
কেউ যদি তাকে কাছে টেনে বলত, ‘আজ কাজ করতে হবে না’—তাহলেও হয়তো তার দিনটা অন্যরকম হয়ে যেত।
আমরা উৎসবকে অনেক সময় নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই দেখি। ঈদ মানে নতুন পোশাক, ভালো খাবার, নামাজ, আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা। এগুলো আমাদের কাছে এত স্বাভাবিক যে ভাবিই না—যে শিশুর প্রতিদিনের খাবার নিশ্চিত নয়, তার কাছে উৎসবের আনন্দটা কেমন?
তার কাছে ঈদ হয়তো নতুন জামার চেয়েও বড় কোনো অপেক্ষা।
আজ একটু ভালো খাবার জুটবে কি না।
আজ কেউ তাকে কাজ করতে বলবে কি না।
আজ রাতটা কোথায় কাটবে।
মায়ের কাছে থাকলে মা তাকে একটু বেশি সময় কাছে রাখবে কি না।
এসব ছোট ছোট বিষয়ই হয়তো তার ঈদ।
একই বয়সের দুটো শিশু একই দিনে বড় হচ্ছে। একজন নতুন জামা পরে ছবি তুলছে, আরেকজন মানুষের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একজনের হাতে ঈদের সালামি, অন্যজনের হাতে হয়তো দিনের কাজের সামান্য টাকা।
একজনের ঈদ জমে থাকবে স্মৃতিতে।
অন্যজনের দিনটা হয়তো শেষ হবে অন্য সব দিনের মতোই।
এই পার্থক্যটা শুধু পোশাকের নয়। এর পেছনে আছে পরিবারের নিরাপত্তা, খাবারের নিশ্চয়তা, থাকার জায়গা, শিক্ষা এবং আপনজনের উপস্থিতি।
তাই ঈদের সময় একটা শিশুকে নতুন জামা দেওয়া নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। একটা নতুন জামা শিশুর মুখে আনন্দ আনতে পারে। সেই আনন্দকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই।
কিন্তু সমস্যাটা তখনই হয়, যখন আমরা জামাটাকেই পুরো দায়িত্ব মনে করি।
ঈদ চলে যায়। জামাটা পুরোনো হয়ে যায়। সেমাইয়ের গন্ধ মিলিয়ে যায়। মানুষের ব্যস্ততা আবার আগের মতো হয়ে যায়।
শিশুটার জীবন কিন্তু থেকে যায়।
তার ক্ষুধা থাকে। কাজের প্রয়োজন থাকে। স্কুলে না যাওয়ার সমস্যা থাকে। অসুস্থ হলে চিকিৎসার দরকার হয়। রাতে ঘুমানোর নিরাপদ জায়গার প্রয়োজন থাকে।
তাই সাহায্য করতে চাইলে শুধু ‘কী দেব?’ এই প্রশ্ন না করে ‘কী দরকার?’—এই প্রশ্নটাও করা দরকার।
কারও দরকার নতুন জামা। কারও দরকার খাবার। কারও চিকিৎসা। কারও স্কুলে ফেরার সুযোগ। আবার এমন শিশুও আছে, যার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো নিরাপদ আশ্রয় এবং এমন একজন দায়িত্বশীল মানুষ, যে তাকে সঠিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
একই সাহায্য সবার জন্য সমান নয়।
আর সাহায্যটা যদি সম্ভব হয়, একদিনের মধ্যে আটকে না রেখে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সহায়তার পথ তৈরি করা ভালো। স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক, সমাজকর্মী বা বিশ্বস্ত শিশু-সহায়তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে শিশুকে নিজের ইচ্ছেমতো কোথাও নিয়ে যাওয়া বা অপরিচিত কারও হাতে তুলে দেওয়া ঠিক নয়। সাহায্য করতে গিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি করা যাবে না।
আর একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—তার সম্মান।
একটা নতুন জামা দেওয়ার সময় শিশুটির ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ না করলেও ভালো কাজটা ছোট হয়ে যায় না। বরং অনেক সময় চুপচাপ সাহায্য করাটাই বেশি মানবিক।
কারণ একজন শিশুর অসহায়ত্ব আমাদের প্রচারের উপকরণ হওয়ার কথা নয়।
আমরা ঈদের আনন্দ ভাগ করতে চাই। ভালো কথা।
তাহলে নিজের জীবনটার দিকেও একবার তাকানো যায়।
আমাদের কতটা কেনাকাটা সত্যিই প্রয়োজন? কতটা শুধু অভ্যাস? একটা পোশাক কম কেনা, সামান্য কিছু খরচ বাঁচানো কিংবা নিজের আনন্দের একটা অংশ অন্য কারও জন্য রেখে দেওয়া—এসব হয়তো দেশের সব শিশুর জীবন বদলে দেবে না।
কিন্তু একটা শিশুর ঈদের দিনটা বদলে দিতে পারে।
হয়তো সে নতুন জামা পরে প্রথমবার আয়নায় নিজেকে দেখবে।
হয়তো সারাদিনের মধ্যে প্রথমবার তার মনে হবে, আজকের দিনটা সত্যিই আলাদা।
এই আনন্দটুকুও কম নয়।
তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ঈদের পরদিনও শিশুটির জীবন আছে।
তাই উৎসবের দিনে আমরা তাকে আনন্দ দিতে পারি, আর উৎসবের বাইরের দিনগুলোতে তার পাশে দাঁড়ানোর পথ খুঁজতে পারি।
কারণ নতুন জামা তার এক দিনের আনন্দ হতে পারে, কিন্তু শিক্ষা, নিরাপত্তা, খাবার আর পরিবারের স্থিরতা তার আগামী দিনের জীবনকে বদলাতে পারে।
ঈদ সবার।
কেউ হয়তো নতুন জামা পরে ঈদ করবে, কেউ পুরোনো জামায়। কিন্তু আনন্দ পাওয়ার অধিকার দুজনেরই সমান।
আর কোনো শিশুর ঈদ কেমন হবে, সেটা শুধু তার ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়াই কি আমাদের একমাত্র পথ?
হয়তো নয়।
হয়তো আমাদের সামান্য ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই কারও ঈদ একটু বেশি ঈদ হয়ে উঠতে পারে।
আর সেই শিশুটি, যে সারা বছর ফুটপাতে মানুষের ভিড় দেখে, অন্তত একটা দিন যেন মনে করতে পারে—
এই শহরে আমাকেও কেউ মনে রেখেছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।