ফুটপাতের শৈশব
পর্ব ৯ — পথশিশু জন্মায় না, তৈরি হয়
জ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৮ আগস্ট ২০২৬
কোনো শিশু জন্মের সময় পথশিশু হয়ে জন্মায় না।
একটা শিশু পৃথিবীতে আসে স্বপ্ন নিয়ে। সে স্কুলে যাবে, খেলবে, বন্ধু বানাবে, বকুনি খাবে, আবার আদরও পাবে। বড় হয়ে কী হবে, সেটা হয়তো সে জানে না। কিন্তু স্বপ্ন দেখার অধিকার তার থাকে।
তবু সব শিশুর জীবন একইভাবে শুরু হয় না।
কেউ খুব অল্প বয়সেই রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। কারও হাতে ফুলের ঝুড়ি, কারও হাতে প্লাস্টিকের বস্তা। কেউ গাড়ির কাচ মুছে, কেউ বোতল-কাগজ কুড়িয়ে, কেউ মানুষের কাছে হাত বাড়িয়ে দিন কাটায়।
আমরা তাকে একটা নাম দিই—পথশিশু।
কিন্তু নামটা তার গল্প নয়।
তার গল্পের পেছনে হয়তো আছে বেকার বাবা, অসহায় মা, অনিয়মিত আয়, ঘরভাড়া, চিকিৎসার খরচ কিংবা পারিবারিক ভাঙন। কোনো পরিবার হয়তো গ্রামের জীবন ছেড়ে শহরে এসেছে এই আশায় যে এখানে কাজ পাওয়া যাবে, জীবন একটু ভালো হবে।
কিন্তু শহর সবসময় সবার স্বপ্ন পূরণ করে না।
কাজ অনিশ্চিত। বাসাভাড়া বেশি। থাকার জায়গা নেই। সংসারে খাবারের নিশ্চয়তা নেই। তখন শিশুর সামান্য আয়ও পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রথমে বলা হয়, ‘কিছুদিন কাজ করুক।’
তারপর সেই কিছুদিন কয়েক মাস হয়ে যায়।
স্কুলে যাওয়া কমে যায়। বই-খাতা দূরে সরে যায়। শিশুটি রাস্তা, কাজ আর মানুষের ভিড়ের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একসময় স্কুলে ফেরাটাই কঠিন হয়ে যায়।
এভাবেই একটা শিশু ধীরে ধীরে তার শৈশব থেকে দূরে সরে যায়।
শুধু শিশুকে রাস্তা থেকে সরালেই কি সমাধান হবে?
ধরুন, আজ একটা শিশুকে ফুটপাত থেকে সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হলো। ভালো কাজ।
কিন্তু তার পরিবার যদি আগের মতোই বেকারত্ব, ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তাহলে কাল আরেকটি শিশু সেই জায়গায় এসে দাঁড়াতে পারে।
তাই পথশিশুর সমস্যা শুধু শিশুর সমস্যা নয়।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, আয়, বাসস্থান, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা।
শিশুকে সাহায্য করতে হলে তার চারপাশের পরিস্থিতিকেও বদলাতে হবে।
পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যদের কাজের সুযোগ দিতে হবে। দরিদ্র পরিবারকে প্রয়োজনভিত্তিক সামাজিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শিশুকে স্কুলে ভর্তি করানোর পাশাপাশি স্কুলে টিকে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। বই, খাবার, পোশাক বা প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে যেন কোনো শিশু ঝরে না পড়ে, সেদিকে নজর দিতে হবে।
আর যে শিশু ইতিমধ্যে স্কুলের বাইরে চলে গেছে, তাকে শুধু ‘স্কুলে যাও’ বললেই হবে না। তার বয়স, শেখার ঘাটতি ও পারিবারিক পরিস্থিতি বুঝে পুনরায় শিক্ষায় ফেরার বাস্তব পথ তৈরি করতে হবে।
শহরে আসা দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটা পরিবার যখন ফুটপাতকে বাসস্থান হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়, তখন শিশুর নিরাপদ শৈশব ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
আমরা অনেক সময় প্রশ্ন করি—
‘ওরা রাস্তায় কেন?’
প্রশ্নটা বদলে করা দরকার—
‘কী কারণে একটা শিশুকে রাস্তায় আসতে হলো?’
দুটো প্রশ্নের মধ্যে পার্থক্য অনেক।
প্রথম প্রশ্নে শিশুটাকেই সমস্যা মনে হয়।
দ্বিতীয় প্রশ্নে আমরা সমস্যার কারণ খুঁজতে শুরু করি।
একটা শিশু রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে বলে সে অপরাধী নয়। সে স্কুলে যেতে পারেনি বলে তার স্বপ্ন ছোট নয়। সে দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলে তার ভবিষ্যৎও দরিদ্র হওয়ার কথা নয়।
আজ তাকে খাবার দেওয়া ভালো।
একটা জামা দেওয়া ভালো।
স্কুলে ফিরিয়ে দেওয়া আরও ভালো।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কাজ হলো এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে আগামীকাল তার নিজের সন্তানকেও যেন একই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকতে না হয়।
কারণ দারিদ্র্য যদি সুযোগের অভাবের সঙ্গে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে যায়, তাহলে একই গল্প বারবার ফিরে আসে।
আজ যে শিশু রাস্তায় কাজ করছে, কাল সে অল্প মজুরির কাজে আটকে থাকতে পারে। তার সন্তানও যদি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সেই সন্তানও একদিন একই রাস্তায় এসে দাঁড়াতে পারে।
এই চক্রটাই ভাঙতে হবে।
পথশিশু কমানোর কাজ তাই শুধু একজন শিশুকে রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়া নয়। এটা পরিবারকে শক্তিশালী করার কাজ। শিশুকে স্কুলে রাখার কাজ। নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার কাজ। শিশুশ্রমের কারণ কমানোর কাজ।
কারণ কোনো বাবা-মা স্বপ্ন দেখেন না যে তাদের সন্তান একদিন ফুটপাতে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে হাত পাতবে।
তারা চান সন্তান ভালো থাকুক, পড়াশোনা করুক, নিজের পায়ে দাঁড়াক।
কিন্তু শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না।
সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার মতো পরিবেশও তৈরি করতে হয়।
পথশিশু জন্মায় না।
পরিস্থিতি তাকে তৈরি করে।
তাই ভবিষ্যৎ বদলাতে হলে শুধু শিশুটিকে নয়, তাকে রাস্তায় এনে দাঁড় করানো পরিস্থিতিটাকেও বদলাতে হবে।
একটা শিশুকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া মানবিক কাজ।
কিন্তু এমন একটা সমাজ তৈরি করা, যেখানে কোনো শিশুকে রাস্তায় আসতেই হবে না—সেটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।