রক্তলজ্জার বাইরে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ১৮ মে , ২০২৬
স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজার পর করিডোরটা খুব দ্রুত ফাঁকা হয়ে গেল। কয়েক মিনিট আগেও যেখানে মেয়েদের কোলাহল, পানির বোতলের শব্দ, শেষ মুহূর্তের নোট মিলিয়ে নেওয়ার ব্যস্ততা ছিল, সেখানে এখন শুধু গরম বাতাস আটকে আছে। জানালার পাশে ধুলো জমা পর্দা একটু নড়ছে। দূরে মাঠে কয়েকটা ছেলে এখনও ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে তর্ক করছে।
ক্লাসরুমের শেষ বেঞ্চে বসে ছিল মুনিয়া। অস্বাভাবিক চুপচাপ। তার ডান হাতটা স্কুলড্রেসের পেছনের অংশে শক্ত হয়ে আটকে আছে। যেন হাত সরালেই দাগটা দেখা যাবে।
নীলা ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বলল,
— যাবি না?
মুনিয়া মাথা নাড়ল।
— একটু পরে।
গলায় এমন এক টান ছিল, যেটা শুনলে বোঝা যায় মানুষ স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে।
নীলা একটু এগিয়ে এসে থেমে গেল। সাদা ড্রেসের পেছনে ছোট্ট লালচে দাগ।
এক সেকেন্ডের জন্য দুজনেই চুপ।
বাইরে কয়েকটা ছেলে হেসে উঠল। খুব সম্ভবত ক্রিকেট নিয়েই কথা হচ্ছিল। তবু মুনিয়ার বুকের ভেতর কেমন শক্ত হয়ে গেল। মনে হলো, হাসিটা বুঝি এই ক্লাসরুম পর্যন্ত চলে এসেছে।
সে খুব নিচু গলায় বলল,
— আমি বাসায় যাব কীভাবে?
নীলা কোনো প্রশ্ন করল না। ব্যাগ খুলে ভাঁজ করা কালো একটা ওড়না বের করল। ওড়নাটায় হালকা সা
বানের গন্ধ ছিল।
— এটা কোমরে বেঁধে নে।
মুনিয়ার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু শব্দ বের হলো না। কিছুক্ষণ পর শুধু বলল,
— আমার কাছে কিছু নেই…
বাকিটা আর বলতে হলো না।
তাদের স্কুলে এসব নিয়ে খুব একটা কথা হয় না। জীববিজ্ঞান বইয়ে দু-এক পৃষ্ঠা আছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে কী করতে হয়, সেটা বেশিরভাগ মেয়েই অন্য মেয়েদের কাছ থেকে শেখে। কেউ ঠিক শেখে, কেউ ভুল শেখে।
নীলা বলল,
— শারমিন আপা অফিসরুমে আছেন। চল।
অফিসরুমের দায়িত্বে থাকা শারমিন আপাকে ছাত্রীরা একটু ভয় পায়। তার গলা কড়া, হাঁটার ভঙ্গি দ্রুত, চশমার ফ্রেম মোটা। মনে হয় সবসময় তাড়া আছে।
মুনিয়াকে দেখে তিনি এক সেকেন্ড থামলেন। তারপর দ্রুত ড্রয়ার খুললেন। প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে চশমা ঠিক করলেন।
— এটা নাও। প্রথম দিন সবারই অদ্ভুত লাগে।
মুনিয়া প্যাকেটটা হাতে নিল। আঙুলগুলো কাগজের গায়ে ঘামে ভিজে যাচ্ছিল।
শারমিন আপা একটু চুপ থেকে বললেন,
— আমার প্রথমবার হয়েছিল ক্লাস এইটে। মনে হয়েছিল শরীরে বড় কোনো অসুখ হয়েছে। কাউকে বলতে পারিনি। পুরো দুপুর বাথরুমে লুকিয়ে ছিলাম।
মুনিয়া এবার তাকাল।
শিক্ষকেরা সাধারণত নিজেদের ভয়ের গল্প বলেন না। হয়তো সে কারণেই ছাত্ররা ভাবতে শুরু করে, বড়রা জন্ম থেকেই শক্ত।
স্কুলের টয়লেটটা খুব পরিষ্কার না। দরজার নিচের কাঠ ফেটে গেছে। কল পুরোপুরি বন্ধ হয় না। মেঝেতে ফিনাইলের সঙ্গে পুরোনো স্যাঁতসেঁতে গন্ধ মিশে থাকে। তবু ওই ছোট্ট জায়গাটাই তখন তার কাছে নিরাপদ লাগছিল।
বের হয়ে এসে সে দেখল, শারমিন আপা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। বিকেলের আলো একটু নরম হয়ে এসেছে।
— ঠিক আছিস?
মুনিয়া ধীরে মাথা নাড়ল।
শারমিন আপা বললেন,
— অসুবিধায় পড়লে চুপ করে থাকবি না। কাউকে বলবি।
নীলা পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। মাঠ তখন প্রায় ফাঁকা। এক কোণে দারোয়ান শুকনো পাতা জড়ো করছে।
পরের সপ্তাহে মেয়েদের টয়লেটের পাশে ছোট্ট একটা কাঠের বাক্স দেখা গেল। উপরে সাদা কাগজে হাতে লেখা— “প্রয়োজনে নিন।”
কোনো ঘোষণা হয়নি। তবু খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না।
প্রথম কয়েকদিন কিছু ছেলে হাসাহাসি করেছিল।
— স্কুলে আবার এসবও রাখতে হয় নাকি?
একদিন দুপুরে দেখা গেল বাক্সটা দেয়াল থেকে খুলে মেঝেতে ফেলে রাখা। পাশে দু-একটা প্যাকেট ছড়িয়ে আছে।
মেয়েদের কেউ কিছু বলছিল না। শুধু অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে ছিল।
মুনিয়ার বুকের ভেতর হঠাৎ গরম একটা রাগ উঠল। কয়েক মাস আগেও সে হয়তো চুপ করে থাকত। এবার থাকল না।
সে নিচু হয়ে প্যাকেটগুলো তুলে আবার বাক্সে রাখল। নীলা চুপচাপ দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল। মুনিয়া তাকাতেই, সে এগিয়ে এসে দারোয়ান কাকুকে ডাকল।
পেছন থেকে এক ছেলে হেসে বলল,
— এত দরকার হলে বাসা থেকে নিয়ে আসবা।
মুনিয়া এবার তাকাল। খুব জোরে না, খুব রাগ নিয়েও না।
শুধু বলল,
— দরকার হলে মানুষ সাহায্য রাখেই।
ছেলেটা আর কিছু বলল না। তবে চোখ সরিয়ে নিল। পাশের বন্ধুটা নিচু হয়ে জুতার ফিতা বাঁধতে লাগল, যদিও ফিতা খোলা ছিল না।
পরের দিন বাক্সটা আবার আগের জায়গায় ঝুলছিল।
একদিন নবম শ্রেণির এক মেয়ে টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। বাসা অনেক দূরে। টাকা আনেনি। কী করবে বুঝতে পারছিল না।
মুনিয়া এবার নিজেই বাক্স খুলে তার হাতে প্যাকেটটা দিল।
মেয়েটা মাথা নিচু করে বলল,
— খুব অস্বস্তি লাগছে।
মুনিয়া একটু থেমে বলল,
— প্রথমে সবারই লাগে।
কথাটা বলেই তার নিজের প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে গেল। শেষ বেঞ্চ। সাদা ড্রেস। আটকে থাকা হাত।
ধীরে ধীরে স্কুলের পরিবেশ বদলাতে শুরু করল। খুব বড় কিছু না। ছোট ছোট আচরণে। কেউ ব্যাগে অতিরিক্ত প্যাড রাখত। কেউ পানি এনে দিত। কেউ অসুস্থ লাগলে পাশে বসে থাকত।
একদিন অ্যাসেম্বলিতে প্রধান শিক্ষক পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কথা বলছিলেন। হঠাৎ বললেন,
— গত সপ্তাহে টয়লেটের বাক্সটা নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছিল। আমি চাই না, এই স্কুলের কোনো মেয়ে শরীরের কারণে ক্লাস মিস করুক।
পুরো মাঠ কয়েক সেকেন্ড চুপ ছিল।
স্কুল ছুটির পর মুনিয়া মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে আলো পড়ছে। গেটের দিকে কয়েকজন ছোট ক্লাসের মেয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের হাঁটার ভেতরে অকারণ সংকোচ নেই।
নীলা পাশে এসে বলল,
— কী ভাবছিস?
মুনিয়া ব্যাগের ভেতরে রাখা কালো ওড়নাটার দিকে একবার তাকাল। তারপর চেইন টেনে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।
গেটের দিকে হাঁটা দিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।