গল্পের নাম: শোনো অবেলার পথিক
কলমে: হিমানী হিমাদ্রি
(প্রথম পর্ব)
শোনো অবেলার পথিক, তোমার উদাসীনতার শহরে আজকাল বড্ড মেঘ জমেছে। আমি না থাকলে তোমার হয়তো দিব্যি কেটে যায়, কিন্তু আমার আকাশটা বারবার ভেঙে পড়তে চায়। সবাই বলছে একলা পথ না হেঁটে এবার একটা স্থায়ী ছাদের নিচে থিতু হতে। তুমি তো বেশ আছো নিজের মৌনতা নিয়ে, কিন্তু আমার এই অবুঝ মনের দায় কি একটুও তোমার নয়?
খুব বেশি সময় কিন্তু হাতে নেই। আমি চাইলেই অন্য কারোর গল্পে নতুন চরিত্র হতে পারি, কিন্তু কেন যেন তোমার ওই অবহেলাটুকুও ছাড়তে পারছি না। দিনশেষে আমার সবটুকু মান-অভিমান সামলে নেওয়ার অধিকার কি তুমি কাউকে দিয়ে দেবে? নাকি নিজেই সেই দায়ভার নেবে?
গোধূলিতে এসে শুধু আমার হাতটা ধরিও। আমি বুঝে নেবো, আমাদের ঠিকানায় ফেরার সময় হয়েছে।
আচ্ছা শোনো—"পুরানো সেই দিনের কথা" কি তবে কেবলই গান হয়ে থাকবে? নাকি আমাদের রূপকথাটা এবার বাস্তবের রূপ পাবে?
ইতি,
তোমার এক আকাশ অভিমান
চিঠিটা ভাঁজ করে বুক পকেটে রাখল অহিদত্ত। ইরার হাতের অক্ষরগুলো যেন একেকটা ধারালো তলোয়ার, যা তার বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রাখা পাথুরে মৌনতাকে চিরে ফেলছে। ইরা তাকে 'অবেলার পথিক' বলেছে—ভুল বলেনি। যে পথে কোনো গন্তব্য নেই, অহিদত্ত তো সেই পথের যাত্রী।
নদীর ওপার থেকে সন্ধ্যারতির ঘণ্টা ভেসে আসছে। ঘাট-প্রান্তের অন্ধকারে একটা পাথরের ওপর সাদা রঙের ছায়ার মতো বসে আছে ইরা। তাকে দূর থেকে দেখে অহিদত্তের বুকটা একবার কেঁপে উঠল। বড়বেলার এই কয়েক বছরে সে কতবার ইরাকে পাশ কাটিয়ে গেছে, কতবার ব্যঙ্গ করে তাকে দূরে ঠেলেছে, কিন্তু আজ আর ফেরার পথ নেই।
অহিদত্ত সামনে এসে দাঁড়াল। স্বভাবসুলভ রুক্ষ গলায় সে বলে উঠল— "তা রাজকন্যের কি আজ অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না? এই সন্ধেবেলায় আঘাটায় বসে মশা মারা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই পণ্ডিতনীর?"
ইরা উঠে দাঁড়াল। অহিদত্তের চোখের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল, "আমি জানতাম তুমি আসবে। তোমার ওই বিষাক্ত ব্যঙ্গটুকুর ওপর আমার দাবি আছে অহি।"
অহিদত্ত একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে নিচু স্বরে বলল, "হাত ধরা সহজ ইরা, কিন্তু সারাজীবন সেই হাত ধরে সমাজের আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটা বড্ড কঠিন। তুমি বামুনপিসি হয়ে এই চণ্ডালের ঘর সামলাতে পারবে তো?"
ইরা কোনো কথা না বলে নিজের ছোট ফর্সা হাতটা দিয়ে অহিদত্তের শক্ত কড়া পড়া হাতটা খপ করে চেপে ধরল। আঙুলগুলোর চাপে এক অদ্ভুত অধিকার। তারপর ফিসফিস করে বলল— "আমি তো শুধু 'অহিদত্ত'-কে চেয়েছি, সমাজকে নয়। তুমি কি এবারও আমাকে শুধু একটা গান হয়েই ফিরে যেতে বলবে?"
গোধূলির সেই আবছা আলোয় অহিদত্ত প্রথমবার ইরার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার বুকের ভেতরকার জমাট বাঁধা পাথরটা যেন এক মুহূর্তে জল হয়ে চোখের কোণে এসে ভিড় জমাল।
কিন্তু এই শুরুটাই কি শেষ? সমাজের রক্তচক্ষু আর জাতের ওই উঁচু পাঁচিল কি সত্যিই তাদের এই অবেলার মিলনকে মেনে নেবে?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।