#তুমি_অনিবার্য
পর্ব: ১২
লেখনী: ইসরাত জাহান
কৃষ্ণনগরের প্রান্তসীমায় যেখানে জলঙ্গী নদী তার চেনা বাঁক ছেড়ে এক নির্জন শ্মশান আর ভাঙা ঘাটের দিকে ধাবিত হয়েছে, সেখানকার বাতাস আজ ভারী হয়ে আছে এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায়। এই সেই পোড়ো ঘাট, যা বছরের পর বছর ধরে মানুষের পায়ের শব্দ শোনেনি। ঘাটের পুরনো ইটগুলো শ্যাওলায় পিছল হয়ে আছে, আর ধসে পড়া গম্বুজের ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসা বট-পাকুড়ের শিকড় যেন কঙ্কালের আঙুলের মতো আঁকড়ে ধরে আছে অতীতের স্মৃতিকে।
মেহু যখন সেই ঘাটের সিঁড়িতে এসে দাঁড়াল, তখন তার সমস্ত সত্তায় এক অমোঘ কম্পন। তার পায়ের নিচের মাটি কাঁপছে না, কাঁপছে তার ভেতরের কয়েক যুগের সংস্কার। সে দেখল, কুয়াশার মতো ভোরের ধোঁয়াশা ভেদ করে ঘাটের একদম নিচে, যেখানে জল আর স্থলের আলিংগন, সেখানে একজন বসে আছে।
সে ঈশান শাহরিয়ার কাজী। পুরো নামটা আজ মেহুর মস্তিষ্কে এক নতুন মুদ্রার মতো ঝনঝন করে বাজল। নামের মতোই তার রূপ আজ রুদ্র এবং সুন্দর। ঈশান শাহরিয়ার কাজী—এই নামে যে আভিজাত্য আর ধার ছিল,সে ঈশান শাহরিয়ার কাজী। নামের আভিজাত্য আজ ধুলোয় মিশে এক ভয়ংকর উন্মাদনায় রূপ নিয়েছে। ঈশান আজ ধবধবে সাদা পোশাকে নেই; তার পরনে একটি কুচকুচে কালো পাঞ্জাবি। সেই কালো কাপড়ের ওপর জমাট বাঁধা রক্তগুলো আলাদা করে বোঝা না গেলেও, পাঞ্জাবির ভিজে থাকা ভারী অংশগুলো জানান দিচ্ছিল সেখানে আজ এক রক্তক্ষয়ী উৎসব চলেছে। কালো রঙের সেই আড়ালে ঈশানকে আজ কোনো সাধারণ যুবক নয়, বরং অন্ধকারের কোনো এক রাজপুত্রের মতো দেখাচ্ছে। তার গায়ের রঙ সেই গাঢ় কালোর বিপরীতে ফ্যাকাশে চাঁদের মতো সাদা, আর চোখের মণি দুটো যেন জ্বলন্ত কয়লা।
মেহু দেখল, ঈশানের সামনে কোনো ক্যানভাস নেই। সে ঘাটের পলিমাটি আর নিজের হাতের তাজা রক্ত মিশিয়ে মেঝের ওপর এক বিশালাকার বৃত্ত তৈরি করেছে। আর সেই বৃত্তের কেন্দ্রে পড়ে আছে মেহুর সেই নীল রঙের শাড়িটা। ঈশান শাহরিয়ার সেই শাড়ির ওপর মুখ গুঁজে পড়ে ছিল, যেন ওটাই তার একমাত্র বেঁচে থাকার রসদ।
মেহুর পায়ের শব্দে ঈশান মুখ তুলল। সেই মুখ দেখে মেহুর আত্মা কেঁপে উঠল। ঈশানের চিবুকে রক্তের ছিটে, কপালে লেপে আছে কাদা। কিন্তু তার চোখের সেই ‘নিকট দৃষ্টি’ আজ এতই তীক্ষ্ণ যে মেহুর মনে হলো তার শরীরের প্রতিটি কোশ ভেদ করে ঈশান শাহরিয়ার তার আত্মাকে ছুঁয়ে দেখছে।
—“এলি তবে?”
ঈশানের কণ্ঠস্বর আজ ভাঙা, কিন্তু তাতে এক অদ্ভুত ‘মায়াবী আকর্ষণ’ আছে। সে উঠে দাঁড়াল। তার দীর্ঘদেহী অবয়ব এবং সেই কালো পাঞ্জাবির ছায়া মেহুর ওপর এক দীর্ঘ অন্ধকার ফেলল। ঈশানের প্রতিটি গতিবিধি ছিল এক আদিম শিকারির মতো ধীর, স্থির এবং লক্ষ্যভেদী।
মেহু পিছু হটতে চাইল, কিন্তু পিছনে ভাঙা দেয়াল। ঈশান শাহরিয়ার কাজী তার দুই হাত দেয়ালের ওপর রেখে মেহুকে তার বাহুবন্ধনীতে বন্দি করল। মেহু অনুভব করল ঈশানের শরীরের সেই প্রখর দহন। তার কালো পাঞ্জাবি থেকে আজ পলিমাটি, রক্ত আর এক অদ্ভুত ‘বিদ্বেষপূর্ণ মুগ্ধতা’র ঘ্রাণ আসছে।
ঈশান তার এক হাত তুলে মেহুর গালের ওপর রাখল। তার আঙুলগুলো ছিল বরফের মতো শীতল, কিন্তু স্পর্শটা ছিল আগুনের মতো উত্তপ্ত। সে মেহুর চোখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—“জানিস মেহু, কাল সারা রাত আমি এই ঘাটের অন্ধকারে তোর চোখের ছায়া খুঁজেছি। তুই ভাবছিস আমি তোকে ভালোবাসি? , আমি দেখতে চাই ওগুলোতে আমার নাম লেখা আছে কি না।”
মেহু কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—“ঈশান.. তুই পাগল হয়ে গেছিস। বাড়ি চল। বাবা তোকে খুঁজছে, পুলিশ খুঁজছে...”
ঈশান শাহরিয়ার খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই কালো পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় তার হাসিটা শ্মশানের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে নদীর ওপারে চলে গেল।
—“পুলিশ? মাজেদুল রায়?
সে হঠাৎ মেহুর চুলের মুঠি ধরে আলতো করে মাথাটা উঁচু করল। মেহুর গ্রীবা আজ ঈশানের উন্মাদনার সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন। ঈশান তার দাঁত দিয়ে নিজের নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরল, যেন সে নিজের ভেতরে থাকা দানবটাকে শাসন করার চেষ্টা করছে।
—“দেখ আমার হাত,”
ঈশান তার রক্তাক্ত হাতের তালুটা মেহুর চোখের সামনে ধরল।
—“এই রক্ত দিয়ে আমি আজ এই আমার হৃদয় শ্মশানের দেয়ালে তোর নাম লিখেছি। তুই যেখানেই যাস মেহু, এই মাটি তোর গন্ধ ছাড়বে না। তুই আমার সেই যা পূর্ণ করার জন্য আমি এই জগতকে ছারখার করে দিতে পারি।
মেহু অনুভব করল তার চোখের জল বাঁধ মানছে না। কিন্তু এই জল কি ভয়ের? নাকি এক অদ্ভুত ‘এসকেপিজম’ বা পলায়নপর আনন্দের? সে ঈশানের সেই সুঠাম বুকের ওপর হাত রাখল। কালো পাঞ্জাবির খসখসে কাপড়ের নিচে ঈশানের হৃদস্পন্দনটা ছিল অনিয়মিত, যেন কোনো বাদ্যযন্ত্র সুর হারিয়েছে।
মেহু ফিসফিস করে বলল,
—“ঈশান, তুই আমাকে মেরে ফেলবি?”
ঈশান শাহরিয়ারের চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল, কিন্তু তার মুখে ছিল সেই একই নিষ্ঠুর হাসি।
—“মেরে ফেললে তো তুই মুক্তি পেয়ে যাবি মেহু। আমি তোকে ‘বন্দি’ রাখব। আমার এই মানসিক গোলকধাঁধায় তোকে আমি এমনভাবে লুকিয়ে ফেলব যে তুই নিজেও নিজেকে খুঁজে পাবি না। তুই যখন আয়নায় তাকাবি, তুই নিজেকে নয়, আমার এই তৃষ্ণার্ত মুখটা দেখবি। তুই যখন অন্য কারো নাম নিতে চাইবি, তোর জিহ্বা কেবল ‘ঈশান শাহরিয়ার’ শব্দটাই উচ্চারণ করবে।”
ঈশান হঠাৎ নিচু হয়ে মেহুর নীল শাড়িটা মাটি থেকে তুলে নিল। সে শাড়িটা মেহুর গলার চারদিকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল যেন ওটা কোনো ফাঁসির দড়ি নয়, বরং এক অদৃশ্য লোহার বেড়ি। সে শাড়ির এক প্রান্ত নিজের হাতে জড়িয়ে ধরে মেহুকে নিজের দিকে হেঁচকা টানে নিয়ে এল।
মেহুর শরীর ঈশানের বলিষ্ঠ দেহের সাথে লেপটে গেল। এই সান্নিধ্য ছিল ভয়ংকর। মেহু অনুভব করল ঈশানের ঠোঁট তার কানের খুব কাছে। ঈশান শাহরিয়ার কাজী ফিসফিস করে বলল,
—“অর্ণব তোকে বলেছিল না ‘অনিবার্য’ শব্দটা? সে কি জানত যে অনিবার্য মানে কেবল প্রেম নয়, অনিবার্য মানে ‘নরক’? তুই কি আমার সাথে সেই নরকে নামবি মেহুলী? যেখানে কোনো মাজেদুল রায় নেই, কোনো জোহরা বিবির বিষাক্ত ফিসফাস নেই। আছে শুধু তুই আর তোর এই ঈশান শাহরিয়ার।”
মেহু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তার নখ দিয়ে ঈশানের কাঁধের সেই কালো পাঞ্জাবি খামচে ধরল। তার কামিজের বুকের কাছের বোতামটা ছিঁড়ে গেল ঈশানের প্রবল টানে। কিন্তু মেহুর মধ্যে তখন কোনো লজ্জা নেই। সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ঢুকে গেছে। সে দেখল নদীর ওপারে সূর্য উঠছে লাল, টকটকে রক্তের মতো এক সূর্য।
মেহু ঈশানের চোখের দিকে তাকিয়ে এক বিচিত্র স্বরে বলল,
—“আমি তো আগেই মরে গেছি ঈশান। সেই রাতে গ্রন্থাগারে যখন তুই আমার ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস নিয়েছিলি, তখনই আমার সরলতা মারা গেছে। এখন যা আছে, তা তোরই তৈরি এক ছায়া। তুই যদি চাস আমাকে পুড়িয়ে ফেলতে, তবে পুড়িয়ে ফেল। কিন্তু মনে রাখিস, আমার ছাইগুলোও তোর পিছু ছাড়বে না।”
ঈশান শাহরিয়ার মেহুর কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। দুজনের ঘাম আর রক্ত একাকার হয়ে গেল। ঈশানের চোখ থেকে এবার অঝোরে জল পড়ছে, কিন্তু তার হাতে মেহুর চুলের মুঠি তখনো শক্ত।
—“তবে তাই হোক,”
ঈশান শাহরিয়ার গর্জে উঠল।
—“আজ থেকে আমরা কোনো বন্ধু নই, আমরা কোনো প্রেমিক যুগল নই। আমরা একে অপরের ‘শিকল’। এই পোড়ো ঘাট সাক্ষী, এই জলঙ্গী সাক্ষী মেহু আর ঈশান শাহরিয়ার কাজী এখন থেকে একই শরীরে দুটি আলাদা আত্মা হয়ে বেঁচে থাকবে। তুই যতবার মুক্তি চাইবি, আমি ততবার তোকে আমার উন্মাদনার জালে জড়িয়ে ধরব।”
হঠাৎ দূরে পুলিশের সাইরেনের শব্দ শোনা গেল। মাজেদুল রায়ের প্রভাবশালী শক্তির নির্দেশে পুলিশ হয়তো ঘাটের দিকেই আসছে। ঈশান ভ্রূক্ষেপ করল না। সে মেহুর হাতটা সজোরে ধরল।
—“পালাবি আমার সাথে? এমন জায়গায় যেখানে শুধু আমাদের ছায়াগুলো কথা বলবে?”
ঈশানের এই প্রশ্নটা ছিল এক অন্তিম আদেশ।
মেহু দেখল দূরে কুয়াশা ভেদ করে পুলিশের গাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। সে একবার রায়বাড়ির সেই লোহার খাঁচার কথা ভাবল, আর একবার ঈশানের এই রক্তাক্ত নরকের কথা ভাবল। সে ঈশানের সেই রক্তাক্ত হাতের মুঠোটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
—“চল ঈশান শাহরিয়ার। আমার ধ্বংসের শুরু তোর হাতেই হোক।”
দুজনে ঘাটের পেছন দিকের জঙ্গলের অন্ধকার পথে অদৃশ্য হয়ে গেল। কৃষ্ণনগরের মানুষ সেদিন থেকে জানল, ঈশান শাহরিয়ার কাজী মারা যাননি, তিনি মেহুকে সাথে নিয়ে এক এমন এক জগতে চলে গেছেন যেখানে ভালোবাসা মানেই হলো এক ভয়ংকর সুন্দর
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।