#তুমি_অনিবার্য
লেখনি :ইসরাত জাহান
Part :07
শহরতলীর দুপুরের আলো তখন ঢলে পড়ছে, সোনালী আভা মেখে নিচ্ছে রাস্তার পাশের নাম-না-জানা গুল্মে আর পুরনো ল্যাম্পপোস্টে। এই পথটুকু তাকে তার নিজের প্রেক্ষাপটের দিকে নিয়ে যায়যে প্রেক্ষাপট অহংকার, প্রাচুর্য বা জটিলতার বদলে গড়ে উঠেছে নির্ভার আস্থা আর ভালোবাসার ভিত্তির উপর।
তার বাড়িটা রায়বাড়ির মতো শতবর্ষের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো গল্প নয়। এটি আধুনিক স্থাপত্যের সরল ছোঁয়ায় গড়া, একফালি সবুজ উঠোন আর সাদামাটা কিন্তু পরিচ্ছন্ন বারান্দা। দরজাটা পেরোতেই তার নাকে এলো মায়ের হাতে বানানো ডালের সুবাস আর বাবার পছন্দের পুরোনো দিনের গানের মৃদু সুর। এই সুবাস, এই সুর এগুলোই ঈশানের জীবনের ধ্রুবতারা।দরজা ঠেলে ঈশান যখন ঘরে পা রাখল, ঠিক তখনই উঠোন পেরিয়ে ঘরে এলো তার বোন, শাপলা। পনেরো বছরের কিশোরী, সদ্য-ফোটা শিউলির মতোই শুভ্র আর কাঁচা। তার নাম শাপলা, আর তার রূপ যেন সত্যিই জলের শাপলার মতোই স্নিগ্ধ। এই বয়সে যখন তার বন্ধুরা নিজেকে আধুনিক প্রসাধনে সাজাতে ব্যস্ত, শাপলা তখন কেবল নিজের সহজাত লাবণ্যেই উজ্জ্বল। লম্বা, ঘন কালো চুলগুলো তার পিঠে আলগাভাবে ছড়িয়ে আছে, আর চোখ দুটো যেন কৃষ্ণপক্ষের আকাশের শেষ তারা। এক অনাবিল, সরল হাসি সবসময় তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে। এই সৌন্দর্য কৃত্রিম নয় এটি যেন ঈশ্বরের হাতে যত্ন করে গড়া এক নিটোল শিল্পকর্ম। এই সারল্যই ঈশানের সবচেয়ে প্রিয়।
শাপলা দরজায় ঈশানকে দেখে তার স্বভাবসিদ্ধ উচ্ছ্বাসে ছুটে এলো
-ভাই! তুমি এত তাড়াতাড়ি? কৃষ্ণনগরে তোমার নাম-ডাক যে হারে বাড়ছে, তাতে তো মনে হচ্ছিল আজ রাতে ফিরবে!"
ঈশান আলতো হেসে শাপলার মাথায় হাত রাখল
-"আমার শাপুর মুখ দেখতে কে না তাড়াতাড়ি ফিরতে চায়? আর শোন, সব নাম-ডাকই মিথ্যে, আসল শান্তি তো এই বাড়িতে।"
শাপলা অভিমান মেশানো কণ্ঠে বলল
-তুমি সবসময় আমাকে বাচ্চা ভাবো! আর শোনো, মা তোমাকে কিছু খেতে দিতে বলল। আজ সন্ধ্যায় না তোমার একটি অনলাইন লেকচার আছে?"
তাদের বাবা-মা আহমেদ কাজীআর রুবিয়া কাজী দুজনেই শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত। তারা ঐতিহ্যবাহী কোনো জমিদার নন, বরং মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি, যারানিজেদের জ্ঞান আর মূল্যবোধের প্রাচুর্যে সংসার সাজিয়েছেন। দিনের শেষে ক্লান্তি নিয়ে ফেরা সত্ত্বেও তাদের চোখে থাকে সন্তানের জন্য অপার স্নেহ আর একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাদের পারিবারিক আলোচনা কখনো উত্তরাধিকার বা সম্পত্তির হিসেব নিয়ে হয় না হয় সাহিত্য, সংস্কৃতি, বা কোনো ছাত্রের জীবনের উন্নতি নিয়ে।
ভেতরে ড্রয়িংরুমে বসে রুবিয়া কাজী তখন একটা বই পড়ছিলেন। ঈশানকে দেখে উঠে এলেন।
-"ফিরেছিস? মেহুদের বাড়ির কাজ শেষ হল? জানি, মাজেদুল রায়ের মতো কঠিন মানুষের সাথে কাজ করা সহজ নয়। কিন্তু মনে রাখিস, কাজ তোর ধর্ম। আর মেহুর সঙ্গে কথা হল?"
মায়ের চোখে কেবল ছেলের জন্য চিন্তা নয়, বরং মেহুর প্রতিও এক প্রচ্ছন্ন উদ্বেগ। রুবিয়া কাজী মানুষ চিনতে ভুল করেন না।ঠিক তখনই আহমেদ কাজী প্রবেশ করলেন। অফিস থেকে ফিরেছেন, পরনে সাধারণ শার্ট আর ট্রাউজার তিনি ঈশানকে দেখে মৃদু হাসলেন।
-"কী রে, তরুণ দার্শনিক, আজ আবার কার জীবনের জটিলতা নিয়ে চিন্তিত? মনে রাখবি, মানুষ যখন সরল পথে চলে না, তখনই তারা জটিলতা তৈরি করে। তুই তোর পথ থেকে বিচ্যুত হবি না।
শাপলা এসে ঈশানের হাতে এক গ্লাস জল দিল। তার পনেরো বছরের সরল দৃষ্টিতে কোনো জটিলতা নেই, নেই কোনো ঈর্ষা বা অধিকারবোধের ছাপ।সূর্য তখন প্রায় ডুবন্ত, তার শেষ রক্তিম আভা জানালা দিয়ে এসে পড়ল শাপলার নিষ্পাপ মুখের ওপর। আকাশের কমলা-লাল রঙ এখন বেগুনি হতে শুরু করেছে। ঈশান এক চুমুকে জলটুকু শেষ করে গ্লাসটা শাপলার হাতে ফিরিয়ে দিল। সে দেখল, বারান্দার কোণে রাখা টবে মায়ের যত্ন করা সন্ধ্যারানী ফুলগুলো সবে পাপড়ি মেলতে শুরু করেছে। এই ফুলগুলোর সৌরভ যেন শুধু সৌরভ নয়, এটি রুবিয়া কাজীর নীরব ভালোবাসার প্রতীক।
ঈশান দেখল, বাবা আহমেদ কাজী অফিস থেকে ফেরার ক্লান্তি সত্ত্বেও সংবাদপত্রটি হাতে নিয়ে চোখ বোলাচ্ছেন। তাঁর শান্ত, ঋজু ভঙ্গিমা দেখে মনে হয় তিনি যেন কোনো সমস্যা নয়, একটি দর্শন নিয়ে মগ্ন আছেন। ঈশানের মনে পড়ল, গত মাসে বাবা গ্রামের একটি স্কুলের সংস্কারের জন্য নিজের শিক্ষকতার পুরস্কারের টাকাটা নিঃশব্দে দান করে দিয়েছিলেন। এই মানুষটি প্রাচুর্যের বদলে পরিতৃপ্তিতে বিশ্বাসী।শাপলা তার স্বভাবসুলভ চঞ্চলতা নিয়ে ঘরজুড়ে ঘুরছিল। সে মেঝেতে বসে মায়ের সেলাই করা কাপড়ের টুকরোগুলো গুছিয়ে রাখছিল, আর মাঝে মাঝে গুনগুন করে গান গাইছিল। তার সেই গান, 'আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার...'। এই গানটা মা আর বাবা প্রায়ই শোনেন।
ঈশান তার ঘরের ছোট টেবিলটার সামনে এসে বসল। তার ল্যাপটপটা পুরনো, কিন্তু তার ভেতরে থাকা জ্ঞানের ভান্ডারটা নতুন। সে তার লেকচারের বিষয়বস্তু একবার চোখ বুলিয়ে দেখল: "The Simplicity of Being: Deconstructing Modern Complexities in Relationships"। তার লেকচারের মূল ধারণা এটাই জীবনকে জটিল না করে এর সরলতাকে উদযাপন করা।
ঘরের এক কোণে বাবার কিনে দেওয়া একটি বই তখনো খোলা রবীন্দ্রনাথের 'শেষের কবিতা'। বইটি তাকে মনে করিয়ে দিল, তাদের পরিবারে সম্পর্কের ভিতটা সবসময়ই গভীর আবেগ আর বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে। সেদিনের অনলাইন লেকচারটি তার জন্য শুধু একটি কাজ নয়, বরং তার পরিবারের শেখানো মূল্যবোধের এক প্রকাশ।
হঠাৎ করেই লোডশেডিং হলো। ঘরটা নিস্তব্ধ অন্ধকারে ঢেকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে শাপলা এসে তার হাতে একটি হারিকেন ধরিয়ে দিল। হারিকেনের স্নিগ্ধ, কম্পিত আলোয় ঈশানের মুখ উজ্জ্বল হলো। এই পুরোনো দিনের আলোতেই যেন তার পরিবার তাদের আধুনিক জীবনের সমস্ত জটিলতা থেকে দূরে, এক সরল আশ্রয়ে বাস করে। এই মুহূর্তটা ঈশানের কাছে তার জীবনের সমস্ত অহংকার, প্রাচুর্য বা জটিলতার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান মনে হলো।হারিকেনের আলোয় ঈশান দেখল, শাপলা তার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে সেই কৃষ্ণপক্ষের আকাশের তারার মতোই নির্মল দৃষ্টি। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তাদের দৈনন্দিন জীবনের দ্রুততা যেন থমকে গেল, এক অপ্রত্যাশিত নীরবতা ঘরে নেমে এল। এই নীরবতা গোলযোগপূর্ণ শহরের কোলাহল বা আধুনিক যোগাযোগের দ্রুত গতির অভাব নয়, এটি ছিল এক ধরনের গভীর প্রশান্তি।
ঈশান হারিকেনটি টেবিলের একপাশে সাবধানে রাখল। ল্যাপটপের স্ক্রিন এখন অন্ধকার, আর ঈশান এই সুযোগটিকে সাদরে গ্রহণ করল। সে অনুভব করল, তার লেকচারের বিষয়বস্তু সম্পর্কের জটিলতা ভাঙা এবং সরলতার উদযাপন' এই মুহূর্তটির মধ্যেই যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম আলোর ঝঞ্ঝাট নেই, নেই ইন্টারনেটের অবিরাম গুঞ্জন কেবল চারপাশের নিস্তব্ধতা আর প্রিয়জনের উপস্থিতি।
শাপলা ধীরে ধীরে বলল,
-"ভাই, অন্ধকারকে তুমি ভয় পাও না, তাই না?"
ঈশান হাসল, সেই হাসি হারিকেনের আলোয় আরও শান্ত লাগছিল
"অন্ধকারকে কেন ভয় পাব, শাপু? এটা তো শুধু আলোর অনুপস্থিতি। আর এই অন্ধকারে আমি আরও ভালো করে শুনতে পাই ।
সে তার হারিকেন উজ্জ্বল টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ঘরের মেঝেতে পায়ের আলতো শব্দ। সে জানত, কিছুক্ষণ পরেই বিদ্যুৎ ফিরে আসবে, কিন্তু এই মুহূর্তের সরলতা আর পবিত্রতা সে তার মনের গভীরে ধরে রাখবে। তার অনলাইন লেকচারটি শুরু হওয়ার আগে এই নীরব প্রস্তুতি তাকে নতুন এক শক্তি জোগালো। এই শক্তি কোনো ডিগ্রি বা উপাধি থেকে আসে না, আসে নির্ভার আস্থা আর ভালোবাসার ভিত্তির উপর গড়ে ওঠা তার এই সাদামাটা বাড়ি থে
কে।
চলবে....??
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।