ঢাকার রাত যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ঢেকে আছে। শহরের কোলাহল স্তিমিত, মাঝে মাঝে কেবল দূরের কুকুরের ডাক কিংবা কোনো গাড়ির হেডলাইট জানালার ফাঁক গলে এসে ঘরের অন্ধকারে ছায়া ফেলে যায়। তবু অভিকের চোখে ঘুম নেই।
বিছানার চাদর এলোমেলো, বালিশের কোণ ভিজে আছে অস্থিরতায়। মনে মনে সে ভাবে,
"রাত যত গভীর হয়, তোমার প্রতীক্ষা তত প্রবল হয়ে ওঠে নিশি। চোখ বুজলেই দেখি তোমার মুখ, শুনি সেই হাসি, অনুভব করি অদৃশ্য নূপুরধ্বনি।"
টেবিলের পাশে রাখা ফোনে এখনো জ্বলজ্বল করছে শেষ মেসেজটি,
"ভালো আছো তো? আজ আকাশটা খুব সুন্দর।"
ছোট্ট সেই বাক্যেই লুকিয়ে আছে এক মহাসমুদ্রের দূরত্ব, এক অসীম প্রতীক্ষা। অভিক বারবার পড়ে, আর প্রতিবারই বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে অদৃশ্য এক সুর।
লাইব্রেরির সুনসান দুপুর। জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া রোদ বইয়ের পাতায় পড়েছিল, আর তার মধ্যেই প্রথম দেখেছিল অভিক নিশিকে। ঝরে পড়া চুলে ঢাকা কপাল, চোখ দুটি গাঢ় মনোযোগে ডুবে আছে রবীন্দ্রনাথের কবিতায়।
— “মাফ করবেন, আপনি কি কবিতাই পড়ছেন?”
অভিকের কণ্ঠে কুণ্ঠা মেশানো কৌতূহল।
নিশি মুখ তুলে তাকিয়েছিল, চোখে যেন অদ্ভুত আলোর ঝলক।
“হ্যাঁ, প্রেমের কবিতা পড়তে ভালো লাগে।”
সেদিনের সেই সামান্য কথোপকথনই ধীরে ধীরে অদৃশ্য সেতু গড়ে দিয়েছিল। লাইব্রেরির টেবিল, একসাথে হাঁটা, চোখে চোখ রাখা—সব মিলিয়ে জন্ম নিয়েছিল অদ্ভুত এক বন্ধুত্বের সূচনা।
ক্যাম্পাসের মাঠ, নদীর ধারের বেঞ্চ—যেখানেই তারা বসত, সেখানে যেন হাসি-আলাপ ভেসে বেড়াত।
একদিন অভিক নিশির দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
“তোমার হাসি যেন কুয়াশা ভেদ করে হঠাৎ উঠে আসা সকালের রোদ।”
নিশির গাল লাল হয়ে উঠেছিল। মৃদু স্বরে বলেছিল,
“অভিক, তুমি আমার পৃথিবীতে আলো এনেছ।”
বন্ধুত্ব নিঃশব্দে, অজান্তেই প্রেমে রূপ নিল।
অভিকের জীবনের পাতায় ছিল কষ্টের আঁচড়। মধ্যবিত্ত সংসারের চাপ, বাবার স্বপ্ন, মায়ের অসুস্থতা, ছোট বোনের পড়াশোনার দায়িত্ব—সবই তার কাঁধে।
“আমার অতীত সহজ নয় নিশি। কিন্তু তুমি তা জানার পরও পাশে আছো—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
নিশি তার হাত শক্ত করে ধরেছিল।
“তোমার ব্যথা আমি ভাগ করে নিতে চাই। তুমি একা নও।”
নিশির জীবন ছিল ভিন্ন রঙে আঁকা। ধনী পরিবারের সন্তান হলেও তার ভেতরে বাস করত একাকীত্ব।
অভিকের সাথে আলাপেই সে প্রথম অনুভব করেছিল—কেউ সত্যিই তাকে বোঝে।
“তুমি আমার আকাশ অভিক। তোমাকে ছাড়া আমার পৃথিবী অসম্পূর্ণ।”
এক সন্ধ্যায় নদীর ধারে হাঁটছিল তারা। হঠাৎ থেমে অভিক বলল,
“নিশি, আমি চাই তুমি আমার পৃথিবী হও।”
নিশির চোখ ভিজে উঠেছিল।
“আমি চাই তুমি থেকো, অভিক। তুমি-ই আমার আকাশ।”
বন্ধুত্ব রূপ নিল এক নিঃশব্দ অথচ অটুট ভালোবাসায়।
চাকরির টানে অভিক ঢাকায়, নিশি তার শহরে। তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠল ফোনের পর্দায়, মেসেজের অক্ষরে, ভিডিও কলে জমা অপেক্ষায়।
“দূরত্ব বড় কষ্টকর, নিশি।”
“আমি জানি। তবু প্রতিটি রাত তোমার প্রতীক্ষাতেই কাটাই।”
সময়ের ব্যস্ততা, অভিমান আর সমাজের চাপের ভেতর ফাঁক বাড়তে লাগল।
“তুমি কি আমাকে ভুলে যাচ্ছ?” নিশির অভিমানী কণ্ঠ।
“না নিশি, মন সবসময় তোমার সাথেই।” অভিকের নিশ্চুপ অঙ্গীকার।
এক রাতে ভুল বোঝাবুঝিতে ভেঙে পড়ল নিশি।
“আমি আর পারছি না, অভিক। এই প্রতীক্ষা আমাকে ভেঙে দিচ্ছে।”
“শুধু বিশ্বাস রেখো। ঝড় পেরোলেই আমাদের ভালোবাসা আরও দৃঢ় হবে।”
শীতের কুয়াশা ভেদ করে এক সকালে অভিক হঠাৎ এসে দাঁড়াল নিশির শহরে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চোখে চোখ মেলতেই সব ব্যথা, অভিমান গলে গেল। তারা নিরব আলিঙ্গনে একাকার হলো।
“আমরা আর আলাদা হব না, নিশি। পরিবার, সমাজ, দূরত্ব—সব কিছুর সঙ্গে লড়ব একসাথে।”
“হ্যাঁ, আমরা একসাথে থাকব। চিরদিন।”
সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের শব্দ শুনছিল তারা। আকাশ ভরা তারারা ঝিকমিক করছিল, আর চোখে চোখ রাখতেই অভিক বলল,
“ঘুম না আসুক, তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ আমি তোমাকে পেয়েছি।”
নিশি মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“আমাদের প্রতীক্ষা বৃথা যায়নি। আজ আমরা এক।”
শহরের সব আলো নিভে গিয়েছিল, তবু তাদের চোখের আলোয় আকাশও হার মেনেছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।