যে অন্যায় কেউ মনে রাখেনি
(নীরবতা, বিবেক ও সামাজিক অপরাধ)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৩ অক্টোবর ২০২৬
গ্রামের সবাই আবদুল করিম সাহেবকে সমীহ করে চলত। বাজারে তাঁর একটা সার-কীটনাশকের দোকান ছিল। হিসাবের ব্যাপারে এক পয়সাও ছাড় দিতেন না। কেউ বাকিতে কিছু নিতে চাইলে খাতাটা খুলে পুরোনো দেনার কথা মনে করিয়ে দিতেন। অথচ গ্রামের সালিশে তাঁর ডাক পড়ত সবার আগে।
শুধু রহিমা বেগম তাঁর নাম শুনলেই দরজা বন্ধ করে দিতেন।
বুড়ি মানুষটার এমন আচরণে গ্রামের কেউ খুব একটা অবাক হতো না। অনেকে বলত, বয়স হলে মানুষ খিটখিটে হয়ে যায়। করিম সাহেবও কথাটা উড়িয়ে দিতেন।
“বুড়ি এখনো তিরিশ বছরের পুরোনো কথা ভুইলা নাই,” একদিন বাজারে বসে বলেছিলেন তিনি। “মানুষের উপকার করলেও দোষ, না করলেও দোষ!”
কথাটা শুনে কয়েকজন হেসেছিল।
রহিমা বেগমের নাতনি মিতু সেদিন বাজারেই ছিল। দাদির সঙ্গে করিম সাহেবের কী হয়েছিল, সেটা জানার কৌতূহল তার অনেক দিনের।
কয়েক দিন পর দাদি অসুস্থ হয়ে বিছানা নিলেন। রাতে মিতু মাথার কাছে বসে পানি খাওয়াচ্ছিল। হঠাৎ রহিমা বেগম বললেন, “করিমরে দেখলাম আজ বাজারে?”
“হ্যাঁ, দাদি।”
বৃদ্ধা মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, “ওর নাম শুনলেও আমার বুকের মধ্যে কেমন করে, জানিস?”
মিতু হাতটা ধরে বলল, “কী করেছিল তোমার সঙ্গে?”
রহিমা বেগম উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেলেন। জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ।
“আমার মানুষটারে বাজারের মাঝখানে খাড়া করাইছিল, মিতু।”
মিতু চুপ করে রইল।
দাদার কথা সে শুনেছে, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে বাড়িতে কেউ কথা বলে না। ছোটবেলায় একবার জানতে চেয়েছিল। মা বলেছিলেন, তাঁর দাদা নাকি চুরির অপবাদে গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
“দাদা চুরি করেছিল?”
রহিমা বেগম মাথা নাড়লেন।
“না রে। খাজনার খাতায় গোলমাল আছে, খালি এই কথাটাই কইছিল। ওইটাই কাল হইলো।”
তারপর আর কিছু বললেন না।
বিছানার পাশে বসে থাকতে থাকতে মিতুর মনে পড়ল, বহু বছর আগে বাবার মুখে শোনা একটা কথা। দাদা নাকি গ্রামের কয়েকজনের কাছ থেকে আবার খাজনা আদায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন। হিসাবের খাতায় একই জমির জন্য দুবার টাকা তোলার প্রমাণও পেয়েছিলেন। এরপর গুদাম থেকে টাকা হারানোর অভিযোগ ওঠে। দাদার নাম ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি।
সেদিন বাজারে অনেক মানুষ ছিল। সালিশ বসেছিল। দাদাকে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে জেরা করা হয়েছিল। তিনি বারবার বলেছিলেন, তিনি চুরি করেননি।
করিম সাহেবও সেখানে ছিলেন। তখন তিনি জমির হিসাব দেখতেন, গ্রামের প্রভাবশালী লোকজনের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা ছিল। হাশেম আলী তাঁকে বিশ্বাস করতেন।
দাদি একবার বলেছিলেন, “তোর দাদা ওর কাছে গিয়া কইছিল, ‘করিম ভাই, আপনি তো খাতার হিসাব জানেন। আমারে একটু বাঁচান।’”
করিম সাহেব কী বলেছিলেন, তা মিতু জানত না। শুধু জানত, তিনি সেদিন কিছু বলেননি।
হাশেম আলীকে গ্রাম ছাড়তে হয়েছিল। অন্য জেলায় কাজ করতে গিয়ে অসুখে মারা যান তিনি। রহিমা বেগম ছেলেকে নিয়ে একা হয়ে পড়েন। অভাবের সময় জমিটুকুও বিক্রি করতে হয়েছিল। ছেলেটা পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নেমেছিল।
এত বছর পরেও দাদি করিম সাহেবের সামনে পড়লে মুখ ফিরিয়ে নিতেন।
মিতু জিজ্ঞেস করল, “তুমি কাউকে বলোনি কেন?”
বৃদ্ধা শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন, “কতজনরে বলব? মানুষ তো আর আমার কথা শুনতে চায় নাই। সবাই কইত, করিমের মতো মানুষ এমন কাজ করব ক্যান?”
পরদিন ভোরে রহিমা বেগম মারা গেলেন।
জানাজার পর করিম সাহেবও তাঁদের বাড়িতে এলেন। উঠানে দাঁড়িয়ে বললেন, “রহিমা অনেক কষ্ট করছে। আল্লাহ ওরে শান্তি দিক।”
মিতু তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
করিম সাহেব পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বললেন, “কোনো দরকার হইলে জানাইও।”
মিতু টাকা নিল না।
“আপনি কি জানতেন, আমার দাদার বিরুদ্ধে অভিযোগটা মিথ্যা ছিল?”
করিম সাহেবের মুখ শক্ত হয়ে গেল। আশপাশে দাঁড়ানো দু-একজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এত পুরোনো কথা এখন তুলে কী হবে?”
“আপনি সেদিন কিছু বলেননি কেন?”
“তখনকার অবস্থা তুই বুঝবি না। সব কথা বলার সময় থাকে।”
মিতু আর কিছু বলল না।
করিম সাহেব টাকা পকেটে রেখে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় পাশের বাড়ির একজনকে বললেন, “মানুষের জন্য কত কিছু করি, তবু শেষ পর্যন্ত বদনামই জোটে।”
কয়েক দিন পর দাদির ঘর গুছাতে গিয়ে মিতু পুরোনো একটা ছবি পেল। ছবিতে হাশেম আলী দাঁড়িয়ে আছেন, পাশে ছোট্ট একটা মেয়ে—তার মা। ছবির পেছনে দাদির কাঁপা হাতে লেখা কয়েকটি কথা:
“সেদিন তুই যদি একবার সত্য কথাটা বলতি, আমার মানুষটারে হয়তো এভাবে হারাইতে হইত না।”
মিতু ছবিটা যত্ন করে তুলে রাখল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।