করুণার খাঁচায় বন্দি গরিব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। এপ্রিল ২৩, ২০২৬
বাংলা সাহিত্যে প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্বের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আমার আজকের লেখা।
বাংলা উপন্যাসে গরিব মানুষ খুব কমই নায়ক হয়। তারা হয় করুণার পাত্র, নয়তো হাসির খোরাক। এই কথাটা পড়ে যদি একটু থামেন, তাহলে হয়তো টের পাবেন—এই অনুভূতিটা আগে থেকেই কোথাও ছিল। শুধু কেউ সরাসরি বলেনি।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি বাঁকবদলের কাজ—এ নিয়ে বিতর্কের জায়গা কম। কুবের, কপিলা, হোসেন মিয়া—এই চরিত্রগুলো এখনো জীবন্ত।
তবু, একটু দূর থেকে দেখলে প্রশ্নটা উঠে আসে—এই দেখার দৃষ্টিটা কার? কুবেরকে আমরা মনে রাখি তার অসহায়ত্বের জন্য, কপিলাকে তার বিপন্নতার কারণে। মানিকের বর্ণনা অসাধারণ—কিন্তু সেই বর্ণনার চোখটা একজন শিক্ষিত শহুরে লেখকের, যিনি ভালোবেসেছেন, কিন্তু ভেতর থেকে কথা বলেননি।
সমালোচক সুধীর চক্রবর্তী বাংলা সাহিত্যে সমাজচেতনা গ্রন্থে লিখেছিলেন, শ্রমজীবী মানুষ বারবার একটি “দেখার বস্তু” (স্পেকটাকল)-এ পরিণত হয়েছে—দেখার জন্য সাজানো, নিজের হয়ে কথা বলার সুযোগহীন। সহানুভূতি থাকলেই দূরত্ব ঘোচে না; অনেক সময় সেটাই নতুন দূরত্ব তৈরি করে।
বাংলা সাহিত্যে একটি অনুপস্থিতি আছে—শ্রমজীবী মানুষের নিজের ভাষায় লেখা সাহিত্য। রিকশাচালক, জেলে, ইটভাটার শ্রমিক—তাদের গল্প কি নেই? তারা কি লেখেনি? নাকি লিখলেও সেটা সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি? সম্ভবত শেষেরটাই সত্যের কাছাকাছি।
কারণ সাহিত্য উৎপাদনের পুরো কাঠামো—লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক, পাঠক—মূলত মধ্যবিত্তের দখলে। এই বৃত্তের বাইরে থেকে কেউ লিখলে, সেটি মূলধারায় পৌঁছাবে কীভাবে?
বাংলায় এই শূন্যতা যখন প্রকট, তখন ভারতের অন্য ভাষায় কী ঘটেছে সেটা দেখা দরকার। মারাঠি দলিত সাহিত্য আন্দোলনে নামদেও ধাসাল বা বাবুরাও বাগুল নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন—সেই তীব্রতা বাইরে থেকে সহানুভূতি দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। বাংলায় মহাশ্বেতা দেবীর অরণ্যের অধিকার বা হাজার চুরাশির মা গুরুত্বপূর্ণ—তবু লেখক এখানে ‘হয়ে’ কথা বলেন, ‘ভেতর থেকে’ নয়।
শরৎচন্দ্রকে গরিবের লেখক বলা হয়। মহেশ গল্পটি তার উদাহরণ। গফুরের কষ্ট পাঠককে নাড়া দেয়—কিন্তু সে কি কখনো নিজের অবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়? সে সহ্য করে, ভাঙে, কিন্তু সমাজকে চ্যালেঞ্জ করে না।
এই প্যাটার্ন তার বহু চরিত্রে ফিরে আসে—তারা শিকার, কিন্তু পরিবর্তনের কারিগর নয়। বিদ্রোহ এলেও তা ব্যর্থতায় শেষ হয়। আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন, বাংলা সাহিত্যে দারিদ্র্য প্রায়ই “নান্দনিক অভিজ্ঞতা”—পাঠকের আবেগ টানার উপকরণ। ফলে গরিব চরিত্র একসময় আয়নায় পরিণত হয়, যেখানে মধ্যবিত্ত নিজের মানবিকতা দেখে আশ্বস্ত হয়।
সম্পূর্ণ অন্ধকার নয়। মানিকের পুতুলনাচের ইতিকথা-য় শ্রেণি প্রশ্ন আসে নতুনভাবে। সমরেশ বসুর গঙ্গা-য় শ্রমজীবীরা নিজের যুক্তিতে চলে। সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড-এ তারা ইতিহাসের অংশগ্রহণকারী। হাসান আজিজুল হকের গল্পে দরিদ্র মানুষ জটিল মানবিক সত্তা।
আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস—চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা—এখানে প্রান্তিক মানুষ ইতিহাস নির্মাতা। তবু সত্যটা রয়ে যায়—এগুলো ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়।
এই সীমাবদ্ধতার কারণ—সাহিত্য কখনোই প্রান্তিক মানুষের হাতে পুরোপুরি ছিল না। যারা লেখেন, ছাপেন, মূল্যায়ন করেন—সবাই একই সামাজিক বৃত্তে। ফলে “কার গল্প সাহিত্য”—এই সিদ্ধান্তও সেই বৃত্তই নেয়।
সহানুভূতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা সমতার বিকল্প নয়। কাউকে ভালোবাসা আর সমান হিসেবে দেখা—এই দুই আলাদা জিনিস।
অপেক্ষা নিষ্ক্রিয়তা নয়। লিটল ম্যাগাজিন, ছোট প্রকাশনা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—এগুলোই নতুন কণ্ঠের জায়গা হতে পারে। সম্পাদকদের সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের সাহিত্য তৈরি করে।
যেদিন একজন রিকশাচালক নিজের উপন্যাস লিখবেন, প্রকাশ করবেন, এবং সেটি মূলধারায় জায়গা পাবে—সেদিন হয়তো বলা যাবে, সাহিত্যের গণতন্ত্র এগিয়েছে।
সেই দিনটা দেখার জন্য বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে।
সেদিনের অপেক্ষায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।