নীরব সাক্ষী
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ৫ জুন, ২০২৬
আমি একটা গাছ। এখন আমার ছায় মানুষ বসে। দুপুরে রোদ চড়া হলে কেউ একটু জিরিয়ে নেয়। পাখিরা আসে, ডালে বসে আবার উড়ে যায়। পাশের বাড়ির বাচ্চাগুলোও মাঝে খেলতে খেলতে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। আমাকে দেখে মনে হতে পারে, আমি বুঝি সবসময় এখানেই ছিলাম। কিন্তু শুরুটা এমন ছিল না।
একসময় আমি একটা বীজ ছিলাম। কোথা থেকে এসেছিলাম, মনে নেই। এসব মনে রাখার উপায়ও নেই। শুধু এটুকু জানি, একদিন মাটির নিচে ছিলাম, আর একদিন মাথার ওপর আলো দেখলাম। তার আগে অনেকদিন শুধু অন্ধকার। উপরে কী হচ্ছে দেখা যেত না। তবে শব্দ পাওয়া যেত। বৃষ্টি পড়ার শব্দ। মানুষের হাঁটার শব্দ। কখনও মাটির ভেতর কিছু একটা নড়ে উঠত। এক বছর, না হয়তো তারও বেশি—সময়টা ঠিক বলতে পারব না।
তারপর একদিন বৃষ্টি হলো। সেই বৃষ্টির পর মাটি নরম হয়ে গেল। আমি ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে শুরু করলাম। খুব সহজ ছিল না। মাটির চাপ ছিল। তবু উঠলাম। প্রথম আলোটা আজও মনে আছে। ঠিক কী রকম ছিল, সেটা ভাষায় বলা মুশকিল। ছোট ছিলাম তখন। এতটাই ছোট যে একটা ছাগল এসে কয়েকটা পাতা খেয়ে ফেললে মনে হতো, আর বুঝি কিছু বাকি রইল না। ছেলেপেলেরা দৌড়াতে গিয়ে গায়ে পা দিয়েছে কতবার। কেউ খেয়ালও করেনি। গরমের দিনে মাটি ফেটে যেত। আবার বর্ষায় এমন বাতাস উঠত যে সারারাত কাঁপতাম। তবু রয়ে গেলাম। সম্ভবত শিকড়গুলো তখন মাটির আরও গভীরে চলে গিয়েছিল।
এরপর ধীরে ধীরে বড় হলাম। কখন যে একটা শালিক এসে ডালে বাসা বানাল, খেয়ালই করিনি। পরে দেখি, শুধু সে না—আরও কত পাখি আসছে। ভোর হলে চারপাশে এত ডাকাডাকি শুরু হতো যে ঘুমানোর সুযোগ থাকলেও ঘুমানো যেত না। অবশ্য গাছের আবার ঘুম কিসের? আমার নিচ দিয়ে কত মানুষ গেছে, তার হিসাব নেই। কেউ তাড়াহুড়ো করে গেছে। কেউ গল্প করতে করতে। কেউ আবার এমন মুখ করে হেঁটেছে, যেন পৃথিবীর সব চিন্তা তার কাঁধে।
একজন বৃদ্ধ মানুষকে মনে আছে। প্রায় রোজ বিকেলে আসতেন। হাতে একটা লাঠি থাকত। এসে কিছুক্ষণ বসে থাকতেন। খুব বেশি নড়াচড়া করতেন না। তারপর একদিন আর এলেন না। প্রথম কয়েকদিন খেয়াল করিনি। পরে মনে হলো, লোকটাকে অনেকদিন দেখা যাচ্ছে না। তারপর আর কখনও না। আমার সামনেই একটা ছেলে বড় হয়েছে। স্কুলে যেত। কাঁধে পুরোনো ব্যাগ। পরে তাকে যুবক হতে দেখলাম। তারপর একদিন দেখি, তার পাশে আরেকটা ছোট্ট ছেলে হাঁটছে। হাত ধরে। সময় যে কখন কেটে যায়, মানুষদের দেখলেই বোঝা যায়। আমি তো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি।
তবে সবকিছু ভালোও ছিল না। আমার গায়ে পেরেক মারা হয়েছে। বিজ্ঞাপন ঝোলানো হয়েছে। কেউ নিজের নাম কেটে লিখে রেখেছে ছালে। কেন করেছে, জানি না। শুধু এটুকু জানি, সেসব দাগ অনেকদিন থাকে। একবার বড় একটা ঝড়ে আমার একটা মোটা ডাল ভেঙে পড়েছিল। কয়েক মাস সেই জায়গাটা ফাঁকা দেখাত। পরে সেখানে আবার নতুন পাতা এলো। নতুন ডালও।
আজ আমি বুড়ো। আগের মতো নেই। কিছু ডাল শুকিয়ে গেছে। গায়ের ছালও রুক্ষ হয়ে গেছে। তবু সকালে রোদ উঠলে ভালো লাগে। বৃষ্টি নামলে এখনও পাতাগুলো নড়ে ওঠে। আর যখন দেখি কোনো পথিক এসে ছায়ায় বসেছে, বা বাচ্চারা খেলছে, তখন মনে হয়, এতদিন দাঁড়িয়ে থাকা একেবারে বৃথা যায়নি।
আর কতদিন থাকব, জানি না। হয়তো কোনো ঝড়ে পড়ে যাব। হয়তো ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাব। এসব নিয়ে খুব একটা ভাবি না। কারণ চারপাশে এখন নতুন নতুন চারা উঠেছে। তাদের দিকে তাকালে নিজের কথা মনে পড়ে। ওদের মধ্যে কেউ হয়তো একদিন অনেক বড় হবে। তার ছায়ায় মানুষ বসবে। কোনো পাখি বাসা বাঁধবে। আর সে হয়তো আমার মতোই দাঁড়িয়ে মানুষদের আসতে-যেতে দেখবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।