উপন্যাসঃ-ছইয়ের নিচে জীবন
গল্প-৩-ছোট্ট শিশুর বড় স্বপ্ন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৬ জুলাই, ২০২৬
হাতে বই থাকার কথা ছিল, অথচ তার হাতে ধরা ছিল ঝাঁপি।
বিকেলের রোদ তখন কাঁশবনের মাথায় হেলে পড়েছে। নদীর চরে জমে থাকা পাতলা কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা ছোট ছায়া ধীরে ধীরে হেঁটে আসছিল। পরনে হাঁটু পর্যন্ত তোলা ময়লা ধুতি, গায়ে জীর্ণ একটা ফতুয়া। বয়স সাত কি আটের বেশি হবে না। অথচ তার ছোট দুটো কাঁধে ঝুলছে বাঁশের বাঁক, দুই মাথায় দুটো গোল কাঠের ঝাঁপি। চরের মেঠো পথ ধরে বাবার পেছন পেছন হেঁটে চলা এই ছেলেটার নাম সুমন।
এই বয়সী আর দশটা বাচ্চা যখন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা কোণে ছুড়ে ফেলে মাঠের দিকে ছোটে, কিংবা কুপির আলোয় বইয়ের পাতায় আঁকাবাঁকা অক্ষরে নিজের নাম লিখতে শেখে, সুমন তখন জীবনের অন্য এক কঠিন অঙ্ক মেলাতে ব্যস্ত। তার ছোট হাত দুটো শক্ত করে ধরে রেখেছে ঝাঁপি, আর ভেতরে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে বিষধর সাপের বাচ্চা। শৈশব বলতে আমরা যে নিষ্পাপ আনন্দ আর বইয়ের গন্ধ বুঝি, সুমনের জীবনে তার ছিটেফোঁটাও নেই।
বেদে বহরের এই যাযাবর জীবন কোনো শিশুর জন্যই সহজ নয়। আজ পদ্মার চরে, কাল মেঘনার মোহনায়, পরশু হয়তো অন্য কোনো অচেনা বাঁকে। নির্দিষ্ট কোনো বাড়ি নেই, স্থায়ী কোনো উঠোন নেই। এই ভাসমান ঘরের ছইয়ের নিচে জন্ম নেওয়া সুমনের মতো শিশুদের কাছে স্কুল বা শিক্ষা যেন রূপকথার গল্পের মতোই দূরের এক কল্পনা। যেখানে ভোর হলেই বেঁচে থাকার লড়াই শুরু হয়, সেখানে বর্ণমালার বই কিনে দেওয়ার সাধ বা সাধ্য কোনোটাই তাদের বাবা-মায়ের থাকে না।
আর সেই সুযোগের অভাবই এই কোমল হাতগুলোতে বইয়ের বদলে তুলে দিয়েছে সাপের ঝাঁপি।
কিন্তু গায়ের জীর্ণ কাপড় কিংবা হাতে ধরা ঝাঁপি দিয়ে কি একটা শিশুর মনের স্বপ্নকে আটকে রাখা যায়? স্বপ্নের কি কোনো সীমানা আছে? নেই। স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার সমান — সে শহরের দালানে বড় হওয়া কোনো ধনী ঘরের সন্তান হোক, কিংবা নদীর জলে ভেসে বেড়ানো কোনো নিঃস্ব বেদের ঘরে জন্ম নেওয়া শিশু।
সুমন যখন গ্রামের মোড়ে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে সাপের খেলা দেখায়, তখন ভিড়ের মধ্যে স্কুলপোশাক পরা ছেলেদের দিকে সে এমনভাবে তাকায়, তার চোখে এক তীব্র আকুতি খেলা করে। তার সমবয়সী কোনো বাচ্চা যখন রঙিন বই খুলে ছবি দেখায়, তখন সুমনের বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। সাপের ফণার আতঙ্ক নয়, তার বুকের ভেতর তখন শিক্ষার আলোর জন্য ডানা ঝাপটায় অন্য এক পৃথিবী।
সুমন হয়তো সারাজীবন এই কাঠের ঝাঁপি কাঁধে নিয়ে এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে ঘুরতে চায় না। সে হয়তো হাত উঁচিয়ে গোখরো নাচানোর বদলে হাতে কলম তুলে নিতে চায়। সে হয়তো একদিন ডাক্তার হয়ে তার বহরের অসুস্থ মানুষগুলোর সেবা করতে চায়, কিংবা শিক্ষক হয়ে তাদের এই অন্ধকার নদী থেকে আলোর তীরে নিয়ে যেতে চায়।
একটাই সত্য, একটাই পথ। শিক্ষার একটু সুযোগই পারে একটা পিছিয়ে পড়া প্রজন্মকে বদলে দিতে। সুমনের মতো বেদে শিশুদের হাতে যদি আজ শিকড়-বাকড় আর ঝাড়ফুঁকের ঝুলির বদলে একটা বই আর একটা পেন্সিল তুলে দেওয়া যায়, তবে এই বহরের দুঃখ আর কুসংস্কারের পুরোনো ইতিহাসটাই বদলে যাবে। যে নদী রোজ তাদের ঘর ভাসিয়ে নেয়, সেই নদীর বুকেই একদিন জ্বলে উঠবে বিদ্যার আলো। আর সেই আলোই তাদের এনে দেবে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার মতো একটা স্থায়ী ঠিকানা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।