সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
গল্প-১
অচেনা হাসি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
২৮, জুন, ২০২৬
অভিক সকালে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড আয়নার সামনে দাঁড়াত। নিজের মুখটা একবার না দেখলে তার দিনটা যেন ঠিক শুরু হতো না। সেদিনও তাই করল। কিন্তু আয়নায় তাকাতেই তার মনে হলো, কিছু একটা ঠিক নেই।
সে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ আয়নায় তার ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসি। মুহূর্তের জন্য। তারপর সব আগের মতো। অভিক চোখ মুছে আবার তাকাল। কিছুই নেই।
নিজেকেই বলল, "হয়তো ঘুমের ঘোর।"
তারপর অফিসে চলে গেল।
পরদিন আবার হলো। এবার সে মাথা একটু কাত করবে, তার আগেই যেন আয়নার মানুষটা সেটা করে ফেলল। এক সেকেন্ডও না। তবু ভুল হওয়ার মতোও না। সারাটা দিন অস্বস্তিটা তাকে ছাড়ল না। অফিসে বসে একটা মেইল তিনবার লিখেও ঠিক করতে পারল না। দুপুরে চা খেতে গিয়ে কাপটা হাত থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।
সহকর্মী জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
অভিক মাথা নেড়ে বলল, “কিছু না।”
কিন্তু সে জানত, কিছু একটা হয়েছে। পরের কয়েক দিন সে আয়নার সামনে দাঁড়ানোই কমিয়ে দিল। তবু প্রতিদিন সকালে অদ্ভুত একটা টান তাকে আবার সেখানে নিয়ে যেত।
একদিন মোবাইলের ক্যামেরা চালু রেখে দাঁড়াল। ভিডিওতে সব স্বাভাবিক। যেটা সে দেখছে, ক্যামেরা সেটা দেখছে না। সেই রাতেই প্রথমবার তার মনে হলো, সমস্যা কী আয়নায়, নাকি তার নিজের ভেতরে? তারপর থেকে ঘুমটা আরও কমে গেল। রাতের পর রাত সে এপাশ-ওপাশ করত। অফিসে গিয়ে ফাইল খুলে বসে থাকত, কিন্তু কী পড়ছে, সেটাই বুঝতে পারত না।
নিশি প্রথমে খেয়াল করেছিল, অভিকের খাওয়া কমে গেছে। তারপর দেখল, কথা বলতে বলতে সে হঠাৎ থেমে যায়। যেন মাঝপথে চিন্তাগুলো কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে।
এক রাতে নিশি জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে তোমার?” “কিছু না।” “আমাকে বলার মতোও না?”
অভিক অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে সব বলল। আয়নার কথা। হাসির কথা। ভিডিওতে কিছু না থাকার কথা।
সব শুনে নিশি কোনো মন্তব্য করল না। শুধু অভিকের হাতটা ধরে বলল,
“তুমি একা একা এটা নিয়ে লড়ছ, এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখাচ্ছে।”
কথাটা শুনে অভিক প্রথমবার বুঝল, শুধু সে নয়, নিশিও এই কয়েক দিন ধরে ভয় নিয়ে বেঁচে আছে।
পরদিন অফিসে একটা রিপোর্টে একই ভুল তিনবার করার পর বস বললেন,
“আজ বাড়ি যাও। বিশ্রাম নাও।”
সেদিন সন্ধ্যায় নিশিই তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গেল।
ডাক্তার মন দিয়ে সব শুনলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন,
“শেষ কবে টানা সাত-আট ঘণ্টা ঘুমিয়েছ?”
অভিক উত্তর দিতে পারল না।
ডাক্তার মৃদু হেসে বললেন,
“অনেক দিন ঠিকমতো ঘুমাচ্ছ না। কাজের চাপও কম নয়। এমন হলে মানুষ এমন কিছু দেখতেই পারে। আমরা ধীরে ধীরে ঠিক করার চেষ্টা করি।”
চিকিৎসা শুরু হলো। নিয়ম করে ঘুম। কিছু ওষুধ। প্রতি সপ্তাহে কাউন্সেলিং। আর সবচেয়ে বড় কথা, অভিক আর নিজের ভয়টা লুকিয়ে রাখল না।
প্রথম দুই সপ্তাহেও তেমন কোনো পরিবর্তন হলো না। কিন্তু ধীরে ধীরে মাথার ভেতরের কুয়াশাটা যেন পাতলা হতে লাগল। এক সকালে সে আবার আয়নার সামনে দাঁড়াল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। কোনো অদ্ভুত হাসি নেই। কোনো আগে-পরে নড়ে ওঠা নেই। শুধু নিজের মুখ।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে নিশি বলল, “কী দেখলে?” অভিক তাকিয়ে হালকা হেসে বলল, “নিজেকেই।” বেশ কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না। বেসিনের কল থেকে টুপটাপ পানি পড়ছিল। বাইরে একটা রিকশার বেল বেজে উঠল। ঘরটা হঠাৎ খুব স্বাভাবিক লাগছিল।
অভিক শেষবারের মতো আয়নার দিকে তাকাল। এবার মানুষটার হাসি আর অচেনা লাগল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।