যে মানুষটি টাকা ধার চায় না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কিছু মানুষ টাকা চায় না, কারণ তারা জানে—টাকার চেয়ে অপমানটা বেশি কষ্ট দেবে।
মাসের শেষ দিকে সেলিমের মানিব্যাগে ছিল তিনশো বিশ টাকা। বাসা ভাড়া দিতে হবে। মেয়ের স্কুলের বেতন বাকি। বাজারও প্রায় শেষ।
স্ত্রী বললেন, ‘তোমার ছোট ভাইকে বললে হয় না?’
সেলিম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘না, ওরও তো সংসার আছে।’
‘তাহলে বড় ভাই?’
‘দেখি।’
সেলিম জানতেন, ‘দেখি’ মানে তিনি কাউকেই বলবেন না। কারও কাছে টাকা চাওয়া তাঁর কাছে শুধু কয়েকটা শব্দ বলা নয়। তার সঙ্গে আরও কিছু ভয় জড়িয়ে থাকে। যদি বলে, ‘এতদিন কী করেছ?’ যদি মনে করে, ‘মানুষটা বুঝি শেষ হয়ে গেছে।’ টাকা দেওয়ার সময় যদি মুখটা এমন করে, যেন উপকার করছে? অথবা টাকা ফেরত দিতে একটু দেরি হলে যদি সম্পর্কের কথাবার্তাই বদলে যায়?
এই ভয়গুলো অনেক সময় টাকার অভাবের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়।
সেলিমের মতো মানুষ তখন নিজের জীবনটাকে ছোট ছোট জায়গায় গুটিয়ে আনেন। বন্ধুরা রেস্টুরেন্টে বসলে বলেন, ‘আজ একটু তাড়া আছে।’ দাওয়াত থাকলে শেষ মুহূর্তে যাওয়ার অজুহাত খোঁজেন। ফোন বেজে উঠলে কখনো কখনো ধরেন না। কারণ ওপাশ থেকে কেউ যদি বলে, ‘কী খবর?’ তখন স্বাভাবিক গলায় ‘ভালো আছি’ বলাটাও কঠিন হয়ে যায়।
অথচ ‘ভালো আছি’ কথাটা বলতে বলতে মানুষ কত কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে। ভাড়া বাকি, বাজার কমে গেছে, ওষুধের টাকা আলাদা করে রাখতে হচ্ছে, সন্তানের স্কুলের বেতন কোন দিন দেওয়া যাবে তার হিসাব নেই। তবু মুখে থাকে, ‘ভালো আছি।’
কারণ আর্থিক সংকটের সঙ্গে টাকার অভাবের পাশাপাশি আত্মসম্মানের লড়াইটাও চলে।
বিশেষ করে পরিবারের কাছে। বাইরের কারও কাছে নিজের অসুবিধার কথা বললে হয়তো একবারই বলতে হয়। কিন্তু ভাই, বোন, আত্মীয় বা পুরোনো বন্ধুর কাছে বললে সেই কথাটা সম্পর্কের ভেতর থেকে যায়। কখনো সরাসরি নয়, কখনো আচরণে, কখনো নিছক একটি প্রশ্নে।
‘টাকা লাগবে নাকি?’
এই প্রশ্নটাও কখনো কখনো অপমানের মতো লাগে।
তাই কেউ কেউ সাহায্য চাওয়ার বদলে নিজের প্রয়োজন কমিয়ে দেন। সেলিমও তাই করছিলেন।
মেয়ের স্কুল থেকে ফোন এল দুপুরে। ‘বেতনটা কবে দেবেন?’
তিনি বললেন, ‘আগামী সপ্তাহে দিয়ে দেব।’
ফোন রেখে মেয়েটা জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, তুমি কি সত্যি পারবে?’
সেলিম হেসে বললেন, ‘পারব।’
মেয়েটা চলে যাওয়ার পর তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর মোবাইলটা হাতে নিলেন। ছোট ভাইয়ের নাম্বার খুললেন।
স্ক্রিনে নামটা জ্বলছিল।
কল করার জন্য আঙুলটা এগিয়েও থেমে গেল। কিছুক্ষণ পর ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিলেন।
মানুষ সবসময় অহংকারের কারণে সাহায্য চায় না, তা নয়। কখনো সে শুধু নিজের দুর্বলতাটা অন্যের সামনে খুলে দিতে ভয় পায়। কারণ টাকা ধার নেওয়া যায়। কিন্তু সেই ধার যদি সম্পর্কের ভেতর একটা নতুন হিসাব খুলে দেয়? সেটা বন্ধ করা কঠিন।
তাই সে নিজের খরচ কমায়। পুরোনো জামা পরে। দাওয়াত এড়িয়ে যায়। বন্ধুর ফোন এড়িয়ে যায়। তারপরও কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘ভালো আছি।’
হয়তো আমাদের চারপাশে এমন মানুষ অনেক আছে। যারা সাহায্য চাইছে না বলে সাহায্যের প্রয়োজন নেই—এমন নয়। হয়তো তারা শুধু চায়, কেউ তাদের দুরবস্থার আগে মানুষটাকে দেখুক।
সেদিন রাতেও সেলিম কাউকে ফোন করেননি। ঘুমানোর আগে মেয়ের স্কুলের বেতনের কথা মনে পড়ল। তারপর বাসা ভাড়ার কথা। তারপর বাজারের।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে আবার ছোট ভাইয়ের নাম্বার খুললেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে স্ক্রিন বন্ধ করে দিলেন।
সকালে মেয়ের স্কুলে যাওয়ার সময় সেলিম পকেটে হাত দিলেন।
তিনশো বিশ টাকাই আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।