ফুটপাতের শৈশব
পর্ব ৮ — রাত নামলে শহরটা বদলে যায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৮ আগস্ট ২০২৬
দিনের শহরটা আমরা খুব ভালো করে চিনি।
সকালে মানুষ কাজে বের হয়। গাড়ি বাড়ে, দোকান খোলে, বাজার জমে ওঠে। বাসস্ট্যান্ডে ভিড় হয়। কেউ অফিসে যায়, কেউ স্কুলে, কেউ নিজের ছোট ব্যবসা নিয়ে বসে। শহর তখন শব্দে আর ব্যস্ততায় ভরা।
সন্ধ্যা নামলে শহর ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেয় নিজেকে। দোকানের শাটার নামে, মানুষ ঘরে ফেরে, রাস্তায় ভিড় কমে আসে। যে ফুটপাত সারাদিন মানুষের চলাচলে ব্যস্ত ছিল, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে জায়গা ফাঁকা হতে থাকে।
কিন্তু সবার দিন শেষ হয় না।
দুপুরে ট্রাফিক সিগন্যালে যে শিশুটাকে দেখেছি, রাতেও হয়তো সে এই শহরেই আছে। শুধু তখন তার হাতে কাজ নেই। আছে একটা জায়গা খোঁজার চিন্তা।
আজ কোথায় ঘুমাবে?
আমাদের এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না। দিনের শেষে আমরা জানি কোথায় ফিরব। দরজা বন্ধ করব, বিছানায় শুয়ে পড়ব। বৃষ্টি হলে ছাদ থাকবে, শীত এলে কম্বল থাকবে। অসুস্থ হলে কাউকে ডাকতে পারব।
একটা পথশিশুর জীবনে এই নিশ্চয়তাগুলো অনেক সময় থাকে না।
ফুটপাতের এক পাশে একটু জায়গা, কোনো দোকানের বারান্দা, বাসস্ট্যান্ডের কোণ—যেখানে সুযোগ মেলে, সেখানেই রাত কাটে। মাথার ওপর ছাদ নেই, চারপাশে অচেনা মানুষের চলাচল, পাশ দিয়ে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে।
তারপরও ঘুমাতে হয়।
কারণ সকালে আবার কাজ শুরু হবে।
একটা শিশুর জীবন যদি প্রতিদিন এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটে, তাহলে সে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববে কখন?
আমরা পথশিশুদের কথা বললে সাধারণত খাবার, পোশাক আর শিক্ষার কথা বলি। অবশ্যই এগুলো জরুরি। কিন্তু নিরাপদে ঘুমানোর জায়গাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে শিশু প্রতিদিন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রাত কাটায়, তার স্বাভাবিক শৈশবও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
তবে শুধু রাতের জন্য একটা জায়গা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
শিশুটি দিনে কোথায় থাকে? স্কুলে যায় কি না? পরিবার আছে কি না? পরিবার থাকলে সেখানে ফিরে যাওয়া নিরাপদ কি না? নিয়মিত খাবার ও চিকিৎসা পায় কি না—এসবও জানতে হবে।
শুরুটা হতে পারে নিরাপদ রাতের আশ্রয় দিয়ে। সেখানে শুধু ঘুমানোর জায়গা নয়, খাবার, বিশুদ্ধ পানি, পরিষ্কার শৌচাগার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রশিক্ষিত কর্মীদের তত্ত্বাবধান থাকা দরকার।
এরপর শিশুটির পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবার খুঁজে পাওয়া গেলে কেন সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, বাড়িতে ফিরলে সে নিরাপদ থাকবে কি না—এসব যাচাই জরুরি। পরিবারে ফেরা সম্ভব না হলে নিরাপদ বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
আর শিশুকে রাতে আশ্রয় দিয়ে সকালে আবার ফুটপাতে পাঠিয়ে দিলে চলবে না। তার শিক্ষা, খাবার, চিকিৎসা এবং প্রয়োজন হলে পরিবারের জন্য সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থাও করতে হবে।
কারণ সব পথশিশুর গল্প এক নয়।
কেউ পরিবারের সঙ্গে থাকে। কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। কেউ কাজের কারণে রাস্তায় রাত কাটায়। কারও পরিবার আছে, কিন্তু অভাব তাকে প্রতিদিন বাইরে থাকতে বাধ্য করে।
তাই সবার জন্য একই সমাধান কার্যকর হবে না।
কারও দরকার পরিবারকে খুঁজে দেওয়া। কারও দরকার নিরাপদ আশ্রয়। কারও দরকার স্কুলে ফেরার সুযোগ। আবার কারও ক্ষেত্রে পরিবারকে সহায়তা করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।
সাধারণ মানুষেরও ভূমিকা আছে। তবে রাতে কোনো শিশুকে একা দেখে নিজের মতো করে তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া বা অপরিচিত কারও হাতে তুলে দেওয়া ঠিক নয়। নিরাপদ সহায়তার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, সমাজকর্মী, বিশ্বস্ত শিশু সুরক্ষা প্রতিষ্ঠান বা জাতীয় শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এর মতো দায়িত্বশীল ব্যবস্থার সাহায্য নেওয়া ভালো।
কারণ ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই যথেষ্ট নয়, সাহায্যের পদ্ধতিটাও নিরাপদ হতে হয়।
রাত নামলে শহরটা বদলে যায়।
আমাদের কাছে দিনের ব্যস্ততা তখন শেষ। কিন্তু কোনো এক ফুটপাতে হয়তো একটা শিশুর দিন তখনও শেষ হয়নি। তার মনে একটাই প্রশ্ন—
আজ রাতে কোথায় ঘুমাব?
আমরা যখন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে নিশ্চিন্তে ঘুমাই, তখন হয়তো কয়েক কিলোমিটার দূরে কোনো শিশু খোলা আকাশের নিচে শুয়ে আছে।
তার ঘর নেই। নিশ্চিত ঠিকানা নেই।
কিন্তু তার তো নিরাপদে ঘুমানোর অধিকার আছে।
একটা শহর কতটা উন্নত, সেটা শুধু তার রাস্তার আলো দেখে বোঝা যায় না। সেই আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে অসহায় শিশুটির জীবনটাও দেখতে হয়।
কারণ শহর সত্যিকারের আলোকিত হয় তখনই, যখন তার আলো শুধু রাস্তা আর ভবনকে নয়, ছায়ায় পড়ে থাকা মানুষগুলোকেও দেখতে শেখে।
আজ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একবার ভাবুন—
আপনার শহরের কত শিশু আজ নিরাপদ জায়গায় ঘুমাবে?
হয়তো আমরা উত্তর জানি না।
কিন্তু প্রশ্নটা করা দরকার।
কারণ কোনো শিশুর রাত যেন শুধু এই অপেক্ষায় না কাটে—
‘কাল সকাল হলে আবার কোথায় দাঁড়াব?’
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।