ফুটপাতের শৈশব
পর্ব ৭ — পথশিশুরও স্বপ্ন আছে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৮ আগস্ট ২০২৬
আমরা অনেক সময় ভাবি, পথশিশুর স্বপ্ন বলতে হয়তো একবেলা পেট ভরে খাওয়া, রাতে মাথা গোঁজার জায়গা পাওয়া কিংবা আজ একটু বেশি টাকা আয় করা। কারণ তার জীবনজুড়ে যখন ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তা, তখন এর বাইরে সে আর কী-ই বা ভাববে?
কিন্তু শিশুর মন এত হিসাব করে চলে না।
অভাবের মধ্যেও সে স্বপ্ন দেখে।
কেউ রাস্তায় গাড়ি যেতে দেখে ভাবে, একদিন সে গাড়ি চালাবে। কেউ স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরের ছেলেমেয়েদের দেখে মনে মনে ভাবে, তারও যদি একটা বই থাকত! কেউ শিক্ষক দেখে শিক্ষক হতে চায়, কেউ ডাক্তার দেখে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
আবার কেউ হয়তো কোনো পেশার নামই জানে না। সে শুধু চায়—বড় হয়ে যেন প্রতিদিন মানুষের কাছে হাত পাততে না হয়।
এই স্বপ্নটাও ছোট নয়।
আমাদের ভুলটা অন্য জায়গায়। আমরা অনেক সময় শিশুর স্বপ্নকে তার বর্তমান অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। নিজের সন্তানের মুখে ‘আমি ডাক্তার হব’ শুনলে তাকে উৎসাহ দিই। কিন্তু একই কথা ফুটপাতে থাকা কোনো শিশু বললে মনে প্রশ্ন জাগে—ও আবার কী হবে?
এই প্রশ্নটাই বদলানো দরকার।
স্বপ্ন দেখার অধিকার কোনো শিশুর আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে নেওয়ার জন্য সুযোগ দরকার। আর পথশিশুদের সবচেয়ে বড় অভাব সেখানেই।
একটা শিশু পড়তে চায়, কিন্তু বই নেই। স্কুলে যেতে চায়, কিন্তু তাকে কাজে যেতে হয়। স্কুলে ভর্তি হলেও কয়েকদিন পর পরিবারের প্রয়োজন তাকে আবার রাস্তায় নিয়ে আসে। ধীরে ধীরে পড়াশোনা কঠিন হয়ে যায়, বন্ধুরা এগিয়ে যায়, আর একসময় সে নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করে—এই জীবনটাই হয়তো তার জন্য।
শুধু তাকে ‘স্কুলে যাও’ বললেই তাই হবে না।
যে শিশু রাতে কোথায় ঘুমাবে জানে না, তার কাছে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাও কঠিন। আগে দরকার নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, চিকিৎসা এবং নিরাপত্তা। তারপর দরকার শিক্ষায় ফেরার বাস্তব পথ।
দীর্ঘদিন স্কুলের বাইরে থাকা শিশুকে হঠাৎ বয়স অনুযায়ী শ্রেণিতে বসিয়ে দিলেই সে মানিয়ে নেবে—এমনটা সবসময় হয় না। তার শেখার ঘাটতি পূরণের জন্য সেতু-শিক্ষা, নমনীয় সময়ের পাঠদান বা বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। লক্ষ্য হবে তাকে ধীরে ধীরে নিয়মিত শিক্ষার ধারায় ফিরিয়ে আনা।
আর শিশুকে কাজে পাঠানো বন্ধ করতে হলে পরিবারকেও দেখতে হবে। পরিবার যদি তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়, শুধু শিশুকে রাস্তা থেকে সরিয়ে আনলে সমস্যা আবার ফিরে আসবে। প্রাপ্তবয়স্কদের কাজের সুযোগ, সামাজিক সহায়তা কিংবা প্রয়োজনভিত্তিক আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে পরিবারকে কিছুটা স্থিতিশীল করা জরুরি।
আরেকটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না—শিশুটির নিজের ইচ্ছা।
সে কী হতে চায়, সেটা তাকে জিজ্ঞেস করা দরকার। হয়তো সে জানে না। তাতেও সমস্যা নেই। পৃথিবীটা দেখার, বই পড়ার, বিভিন্ন পেশার মানুষকে চেনার সুযোগ পেলে একদিন সে নিজের স্বপ্নটা নিজেই খুঁজে নিতে পারবে।
একটা শিশুকে সাহায্য করার অর্থ তার হয়ে জীবন বেছে দেওয়া নয়। বরং তাকে এমন একটা জায়গায় পৌঁছে দেওয়া, যেখানে একদিন সে নিজেই বলতে পারে—আমি কী হতে চাই।
আমরা জানি না, আজ ফুটপাতে বসে থাকা শিশুটার ভবিষ্যৎ কী। হয়তো সে শিক্ষক হবে, হয়তো চালক, কারিগর, ব্যবসায়ী কিংবা এমন কিছু করবে, যার কথা আজ সে নিজেও জানে না।
কিন্তু সুযোগ না দিলে তার সম্ভাবনাটা আমরা কোনোদিন জানতে পারব না।
তাই পথশিশুকে দেখলে শুধু তার বর্তমানটা দেখবেন না। তার ভেতরের সম্ভাবনাটাও দেখুন।
একটা বই দেওয়া যায়। তার পড়ার ব্যবস্থা করা যায়। পরিবারকে সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। তার কথা শোনা যায়।
আর সবচেয়ে সহজ কাজটা করা যায়—
একবার জিজ্ঞেস করা যায়,
‘তুমি কী হতে চাও?’
হয়তো সে উত্তর দেবে না। হয়তো বলবে, ‘জানি না।’
কারণ বেঁচে থাকার চিন্তায় থাকা শিশুকে স্বপ্নের কথা জিজ্ঞেস করার মানুষ হয়তো খুব কমই ছিল।
তাই প্রশ্নটা করা দরকার।
হয়তো সেই প্রশ্ন থেকেই তার জীবনে একটা নতুন দরজা খুলবে।
পথশিশুর স্বপ্ন ছোট নয়। শুধু সেই স্বপ্নে পৌঁছানোর পথটা অনেক কঠিন। আর সেই পথটা একটু সহজ করে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।