ফুটপাতের শৈশব
পর্ব ৫ — আমরা তাদের দেখি, কিন্তু দেখি না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৮ আগস্ট ২০২৬
প্রতিদিন তাদের পাশ দিয়ে যাই। দেখি। তারপর চলে যাই।
রাস্তার মোড়ে, বাসস্ট্যান্ডে, ট্রাফিক সিগন্যালে, বাজারের ভিড়ে কিংবা কোনো দোকানের সামনে—কোথাও না কোথাও একটা শিশু থাকেই। কারও হাতে ফুলের ঝুড়ি, কারও হাতে প্লাস্টিকের বস্তা। কেউ গাড়ির কাচ মুছে, কেউ মানুষের কাছে হাত বাড়ায়। কেউ আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
আমরা তাদের দেখি।
কিন্তু সত্যিই কি দেখি?
শিশুটাকে চোখে পড়ে, তার জীবনটা পড়ে না।
আমরা ব্যস্ত থাকি। ফোনে কথা বলতে বলতে পাশ কাটিয়ে যাই। গাড়ির জানালা তুলে দিই। কেউ বিরক্ত হয়ে বলে, ‘যাও, যাও।’ কেউ আবার এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেন শিশুটিকে দেখাটাই একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার।
অস্বস্তি হওয়ার কারণও আছে। একটা ছোট শিশু যখন মানুষের কাছে হাত বাড়ায়, তখন নিজের জীবনটাকেও একটু প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাতে হয়।
সে কেন এখানে?
কেন তার হাতে বই নেই?
কেন সে স্কুলে নেই?
কেন তার দিনের শুরু হয় কাজ দিয়ে?
এসব প্রশ্নের উত্তর জানার চেয়ে না দেখেই চলে যাওয়া অনেক সহজ।
আমরা প্রায়ই একটা শিশুকে তার কাজ দিয়েই বিচার করি।
সে ভিক্ষা করছে—বিরক্তিকর।
সে গাড়ির কাচ মুছছে—বিরক্ত করছে।
সে রাস্তার পাশে বসে আছে—শহরটা নোংরা করছে।
কিন্তু এসবের বাইরে শিশুটার পরিচয় কী?
তারও একটা নাম আছে। হয়তো কোনো মা তাকে আদর করে একটা ডাকনাম দিয়েছিলেন। হয়তো কোনো খাবার তার খুব পছন্দ। হয়তো অন্য শিশুদের স্কুলে যেতে দেখে তারও ইচ্ছে হয়। হয়তো কোনোদিন স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সে ভেতরে তাকিয়ে ছিল।
এসব আমরা জানি না।
কারণ জানার চেষ্টাও করি না।
আমরা দারিদ্র্যটা দেখি, মানুষটাকে দেখি না।
তার পুরোনো জামাটা দেখি, কিন্তু জামার ভেতরে থাকা শিশুটাকে দেখি না।
তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা দেখি, কিন্তু সেই হাত কেন বাড়াতে হয়েছে, সেটা জানতে চাই না।
অবশ্যই সবাইকে টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। প্রতিবার টাকা দেওয়াই সমস্যার সমাধানও নয়। কেউ টাকা না দিলে তাকে দোষ দেওয়ারও কারণ নেই।
কিন্তু টাকা না দেওয়ার সঙ্গে অপমান করার সম্পর্ক কোথায়?
একটা শিশু সাহায্য চাইলে তাকে ধমক দিতে হবে কেন? গালি দিতে হবে কেন? এমনভাবে তাড়িয়ে দিতে হবে কেন, যেন সে মানুষই নয়?
শান্তভাবে বলা যায়, ‘আজ দিতে পারছি না।’
কথাটা ছোট। কিন্তু সম্মানটা বড়।
সাহায্য করার ক্ষেত্রেও আমাদের একটু সচেতন হওয়া দরকার। শিশুটিকে খাবার দিতে পারি, প্রয়োজন হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করতে পারি। সে বিপদে থাকলে নিজের মতো করে কোথাও নিয়ে যাওয়ার বদলে দায়িত্বশীল ব্যক্তি, সমাজকর্মী বা শিশু সহায়তা ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা নিরাপদ।
কারণ ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই সবসময় ভালো ফল হয় না। ভুলভাবে সাহায্য করতে গিয়ে একটা শিশুকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া সম্ভব।
আর একটা বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—শিশুর সম্মান।
একটা শিশুকে খাবার দিয়ে তার ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা সাহায্যের প্রমাণ নয়। তার কষ্টকে নিজের ভালো কাজের প্রচারের উপকরণ বানানোর দরকার নেই। ছবি, নাম, ঠিকানা বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের আগে তার নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে।
সাহায্য করতে হলে মানুষটাকে ছোট না করেও করা যায়।
বরং সেটাই হওয়া উচিত।
সবসময় টাকা দিয়ে সাহায্য করাও জরুরি নয়। কখনো একটা ভালো কথা বলা যায়। একটু সময় দেওয়া যায়। তার নাম জানতে চাওয়া যায়।
হয়তো সে উত্তর দেবে না। হয়তো সন্দেহ করবে। হয়তো অভ্যাসবশত দূরে সরে যাবে।
তবু একবার ভাবুন—সারাদিনে কত মানুষ তাকে তাড়িয়ে দেয়। কতজন বিরক্ত হয়। কতজন তার দিকে তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
তারপর একজন মানুষ যদি একটু থেমে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার নাম কী?’
হয়তো শিশুটি অবাক হবে।
হয়তো একটু হাসবে।
হয়তো কিছুই বলবে না।
তবু কয়েক মুহূর্তের জন্য সে বুঝতে পারে—কেউ তাকে শুধু রাস্তার একটা শিশু হিসেবে দেখেনি।
সমাজ বদলানোর কথা আমরা অনেক বলি। কিন্তু সমাজ আসলে তৈরি হয় আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ দিয়ে।
রাস্তার একটা শিশুকে দেখে আমরা কী করি, কীভাবে কথা বলি, সাহায্য করতে না পারলে কীভাবে ফিরিয়ে দিই—এসবও সেই সমাজেরই অংশ।
সব পথশিশুকে আমরা রাস্তা থেকে সরিয়ে আনতে পারব না। তাদের জীবনের সব সমস্যার সমাধানও আমাদের হাতে নেই।
কিন্তু আমাদের আচরণটা আমাদের হাতেই আছে।
তাই পরেরবার রাস্তার পাশে কোনো শিশুকে দেখলে অন্তত তাকে অবহেলার চোখে দেখবেন না।
টাকা দেবেন কি দেবেন না, সেটা আপনার সিদ্ধান্ত।
কিন্তু তাকে অপমান না করাও একটা সিদ্ধান্ত।
হয়তো আপনি তার জীবন বদলে দিতে পারবেন না। আজকের ক্ষুধা মিটিয়ে আগামী দিনের অনিশ্চয়তাও দূর করতে পারবেন না।
তবু সম্মান দিয়ে কথা বলতে পারবেন।
কারণ পথশিশুরা আমাদের শহরের বাইরের কেউ নয়।
তারা এই শহরেরই শিশু।
তাদের জীবন আমাদের মতো নয়, কিন্তু ক্ষুধা তাদেরও লাগে, ভয় তাদেরও হয়, আনন্দে তারাও হাসে, কষ্ট পেলে তারাও চুপ করে যায়।
আমরা তাদের প্রতিদিন দেখি।
এবার একটু থেমে মানুষ হিসেবেও দেখি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।