শাড়ির ভাঁজে লুকানো চিঠি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
মায়ের পুরোনো শাড়িটা বিক্রি করতে গিয়ে নিলয় এমন কিছু পেল, যেটার জন্য তার হাতটা মাঝপথে থেমে গেল।
শাড়িটা খুব দামি ছিল না। নীল রঙের সাধারণ একটা সুতি শাড়ি। রং কিছুটা ফিকে হয়ে গেছে। ভাঁজে ভাঁজে ন্যাপথলিন আর পুরোনো দিনের গন্ধ।
তবু এই শাড়িটা আলাদা ছিল। মা এই শাড়িটা পরলে নিলয়ের মনে হতো, ঘরটা একটু অন্যরকম হয়ে যায়।
কিন্তু সেদিন স্মৃতির কথা ভাবার সময় ছিল না। ছোট বোন নীহার কলেজের ভর্তি ফি দিতে হবে। নিজের চাকরিটাও কয়েক মাস ধরে ভালো যাচ্ছে না। বাড়িভাড়া, বাজার আর ঋণের কিস্তি দিতে দিতে হাতে কিছুই থাকছে না।
তাই মায়ের রেখে যাওয়া কিছু জিনিস বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। সিদ্ধান্তটা নেওয়ার পর থেকেই বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি ছিল। মনে হচ্ছিল, সে যেন মায়ের জিনিস নয়, মায়ের একটা অংশ সরিয়ে ফেলছে।
মা মারা যাওয়ার তিন মাস হয়েছে।
এই তিন মাসে নিলয় একটা জিনিস বুঝেছে, মানুষ চলে যাওয়ার পরও তার কিছু অভ্যাস ঘরের মধ্যে থেকে যায়।
রান্নাঘরের তাকে রাখা হলুদ মাখা মশলার কৌটা। বারান্দার কোণে মায়ের লাগানো মানিপ্ল্যান্ট গাছটা। বিকেলে জানালার পাশে রাখা বেতের চেয়ারটা।
সবকিছু আগের মতো আছে। শুধু মা নেই।
মায়ের আলমারিটা নিলয় এতদিন খোলেনি। সেদিন খুলতে হলো।
একটার পর একটা শাড়ি বের করছিল সে। হাতে নিলেই মনে হচ্ছিল, প্রতিটা কাপড়ের সঙ্গে একটা করে দিন আটকে আছে।
হঠাৎ মনে হলো, মা থাকলে হয়তো বলতেন, "যদি দরকার হয়, নিয়ে যা বাবা।"
এই কথাটা মনে পড়তেই নিলয় কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
নীল শাড়িটা হাতে আসতেই সে থেমে গেল।
এই শাড়িটা মা খুব যত্ন করে রাখতেন। নিলয় একবার জিজ্ঞেস করেছিল, "এই পুরোনো শাড়িটা ফেলে দাও না?"
মা হেসে বলেছিলেন, "সব পুরোনো জিনিস ফেলে দিতে নেই। কিছু জিনিস শুধু মনে রাখার জন্য থাকে।"
তখন কথাটার মানে বুঝতে পারেনি। আজ বুঝতে পারছে।
শাড়িটা ভাঁজ করতে গিয়ে হঠাৎ তার হাত থেমে গেল। ভেতরে কিছু একটা শক্ত লাগছে।
সে ধীরে ধীরে ভাঁজ খুলল। একটা ছোট খাম। হলদে হয়ে যাওয়া।
খামের ওপর লেখা, "নিলয়ের জন্য।"
মায়ের হাতের লেখা।
নিলয় কিছুক্ষণ খামটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে খুলল।
ভেতরে ছোট একটা কাগজ। মাত্র কয়েকটা লাইন।
"নিলয়,
জীবনে কখনো যদি মনে হয় তুই একা, তাহলে মনে করিস, ছোটবেলায় তুই ভয় পেলে আমার হাত খুঁজতিস।
আমি না থাকলেও তুই নিজের হাতটা শক্ত করে ধরিস।
আর একটা কথা, নিজের জন্য বাঁচতে ভুলে যাস না।
—মা"
চিঠিটা পড়ে নিলয় অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
এটা কোনো বিদায়ের চিঠি ছিল না। কোনো বড় উপদেশও ছিল না। তবু কয়েকটা শব্দের মধ্যে সে মাকে খুঁজে পেল।
হঠাৎ মনে পড়ল, শেষ দিকে মা নিজের চিকিৎসার কথা প্রায়ই এড়িয়ে যেতেন। ডাক্তার দেখানোর কথা বললে বলতেন, "আগে তোর কাজটা ঠিক হোক।"
তখন নিলয় বিরক্ত হতো। ভাবত, মা নিজের যত্ন নেন না কেন।
আজ বুঝল, মা হয়তো সারাজীবন এমনই ছিলেন। নিজের কথাটা সবসময় শেষে রাখতেন।
সেদিন নিলয় শাড়িগুলো বিক্রি করল না। আবার আলমারিতে তুলে রাখল।
তবে সমস্যাগুলো শেষ হয়ে গেল না। পরদিনও তাকে টাকা জোগাড় করতে হয়েছে। কিছু মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হয়েছে। কিছু পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছে।
কিন্তু সেদিন রাতে মায়ের চিঠিটা বালিশের পাশে রেখে ঘুমানোর সময় তার মনে হচ্ছিল, কঠিন সময়টা সে একা পার করছে না।
কয়েক মাস পর। নীহার কলেজে ভর্তি হয়ে গেল।
সেদিন রাতে নিলয় আবার আলমারি খুলল। নীল শাড়িটা বের করল। বিক্রি করার জন্য নয়। শুধু একটু ছুঁয়ে দেখার জন্য।
শাড়ির ভাঁজে আর কোনো চিঠি ছিল না।
কিন্তু নিলয়ের মনে হলো, মায়ের কথাগুলো এখনও সেখানে আছে। পুরোনো কাপড়ের গন্ধে। আলমারির নীরবতায়। আর তার নিজের ভেতরে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।