ক্ষমা চাওয়ার আগেই
(মা, স্মৃতি ও দেরিতে বোঝা কথা)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৩ অক্টোবর ২০২৬
মা ছেলেকে বলেছিলেন, “একদিন বুঝবি।” ছেলে ভেবেছিল, মা রাগ করে বলেছেন। মায়ের মৃত্যুর পর সে বুঝল, কথাটা কোনো অভিশাপ ছিল না—ছিল এমন একটা সত্য, যা বুঝতে তার অনেক দেরি হয়ে গেছে।
সজীবের বিয়ের পর থেকেই সংসার নিয়ে মায়ের সঙ্গে ছোটখাটো কথা-কাটাকাটি হতো। মা চাইতেন, বউয়ের সঙ্গে কোনো সমস্যা হলে ছেলেটা একটু ধৈর্য ধরুক। রাগের মাথায় এমন কিছু না বলুক, যা পরে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।
সজীবের কাছে এসব ছিল পুরোনো দিনের উপদেশ। তার মনে হতো, মা সবকিছুতেই নাক গলান। নিজের সংসার কীভাবে চলবে, সেটা সে নিজেই ভালো বোঝে।
একদিন তুচ্ছ একটা বিষয় নিয়ে তৃষার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল তার। মা পাশের ঘর থেকে এসে বলেছিলেন, “রাগ হইছে, হোক। তাই বইলা এমন কথা কইস না, যেটা পরে চাইলেও ঠিক করতে পারবি না।”
সজীব বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “মা, তুমি আমাদের ব্যাপারে নাক গলিও না তো। সবকিছুতে তোমার কথা শুনতে হবে কেন?”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর আর কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিলেন।
পরদিন সকালে কাপড়চোপড় গুছিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা বললেন। সজীব আটকায়নি। বরং মনে মনে স্বস্তি পেয়েছিল। সংসারে আরেকজনের মতামত নিয়ে ভাবতে হবে না।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মা শুধু বলেছিলেন, “একদিন বুঝবি।”
সজীব তখন কথাটার কোনো উত্তর দেয়নি।
এরপর কয়েক মাস কেটে গেল। ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা হতো, তবে আগের মতো নয়। সজীব ব্যস্ততার কথা বলে তাড়াতাড়ি ফোন রেখে দিত। মা-ও আর বেশি কিছু জানতে চাইতেন না।
একদিন তৃষার সঙ্গে বড় ঝগড়া হলো তার। রাগ করে তৃষা বাবার বাড়ি চলে গেল। যাওয়ার আগে এমন কিছু কথা বলে গেল, যেগুলো সজীবের মাথায় ঘুরতে লাগল সারা রাত।
ফোন হাতে নিয়েও সে তৃষাকে ফোন করল না। ভাবল, দু-এক দিন গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তারও তো আত্মসম্মান আছে।
পরদিন সকালে গ্রামের বাড়ি থেকে ফোন এল। মা ঘুমের মধ্যেই মারা গেছেন।
খবরটা শোনার পর সজীব অনেকক্ষণ বসে ছিল। কান্না এসেছিল কি না, সে নিজেও বুঝতে পারেনি। শুধু মনে হচ্ছিল, মায়ের সঙ্গে তার কিছু কথা বাকি রয়ে গেছে।
দাফন শেষে বাড়ি গোছাতে গিয়ে মায়ের আলমারির নিচের তাকে একটা পুরোনো খাম পেল। খামের ওপর তার নাম লেখা। ভেতরে ছোট্ট একটা কাগজ।
মায়ের হাতের লেখা।
“বাবা, তুই যখন কইলি আমি নাক গলাই, আমার খুব কষ্ট লাগছিল। আমি তোর খারাপ চাই নাই। একদিন বুঝবি।
— মা”
সজীব কাগজটা হাতে নিয়ে বসে রইল। বাইরে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।
মায়ের কথাগুলো সে আগেও শুনেছে। সেদিনও শুনেছিল। শুধু তখন কথাগুলোর পেছনে থাকা মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করেনি।
ফোনটা হাতে নিয়ে মায়ের নম্বর খুলল সে। নম্বরটা এখনো সংরক্ষিত আছে—‘মা’ নামে।
কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।