বাবার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য
(পরিবার, স্মৃতি ও চাপা সত্য)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৩ অক্টোবর ২০২৬
বাবার মৃত্যুর দশ দিন পর সম্পত্তি ভাগের বৈঠকে ছোট চাচা বললেন, “তোর বাবা নীলাকে খুব ভালোবাসত। মেয়েটার জন্য কত চিন্তা করত!”
রাশেদ কলমটা নামিয়ে রাখল। পাশের ঘরে নীলা মায়ের ওষুধ গুছাচ্ছিল। একটা ট্যাবলেট মেঝেতে পড়ে গড়িয়ে গেল। সে তুলে নিয়ে আবার আগের কাজে মন দিল।
“কী হলো? সই করছিস না কেন?” চাচা জিজ্ঞেস করলেন।
রাশেদ দলিলের দিকে তাকাল। বাবার চশমাটা কাগজের ওপর পড়ে আছে। এক কাচে সরু ফাটল।
“নীলার ভাগের কথা হলো না তো।”
চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন, “ওর ব্যবস্থা পরে হবে। আগে নিজেদের ভাগাভাগিটা শেষ করি।”
নীলা দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। হাতে একটা পুরোনো খাম।
“আমার কথা পরে বললেই হয়, চাচা। বারো বছর তো পরেই রইল।”
ঘরে সবাই তার দিকে তাকাল।
খাম থেকে ভাঁজ করা চিঠি বের করে সে টেবিলে রাখল। কাগজের রং হলদেটে, কয়েক জায়গায় কালি ছড়িয়ে গেছে।
“বিয়ের পর বাবাকে লিখেছিলাম। দিতে পারিনি।”
চাচা হাত নেড়ে বললেন, “এসব এখন কী দরকার? সম্পত্তির কথা হচ্ছে, নীলা।”
নীলা চিঠিটা খুলে পড়ল, “বাবা, ওরা আমার ফোন নিয়ে নিয়েছে। কার সঙ্গে কথা বলি, সব জিজ্ঞেস করে। রাতে দরজা বন্ধ করে রাখে। আমি ভয় পাই। তুমি আমাকে নিতে আসবে?”
পড়া শেষ করে সে চুপ করে রইল।
বারো বছর আগে এই বাড়িতেই সে বাবাকে বলেছিল, বিয়ে করতে চায় না। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করতে চায়। বাবা শুনেছিলেন, তারপর নিজের পছন্দের পাত্রের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছিলেন।
বিয়ের তিন মাস পর নীলা ফিরে এলে বাবা বলেছিলেন, “সংসার করতে গেলে একটু-আধটু সহ্য করতে হয়।”
রাশেদ তখন পাশেই ছিল।
সে বোনের চোখের দিকে তাকাতে পারেনি। বাবাই তখন তার বিদেশ যাওয়ার খরচ দিয়েছিলেন। নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চায়নি সে। নীলাকে শুধু বলেছিল, “কিছুদিন থাক। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিছুই ঠিক হয়নি।
ছোট চাচা চেয়ারে নড়েচড়ে বসলেন। “তোর বাপে কি তোরে কম করছে? লেখাপড়া করাইছে, বিয়ে দিছে। এখন মানুষটা মরে যাওয়ার পর এইসব কথা তুলে কী প্রমাণ করতে চাস?”
নীলা চিঠিটা ভাঁজ করতে করতে বলল, “কিছু প্রমাণ করতে চাই না, চাচা। শুধু একবার চেয়েছিলাম, বাবা আমার কথাটা বিশ্বাস করুক।”
রাশেদের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“আমি জানতাম, নীলা,” সে বলল। “তবু চুপ ছিলাম। বাবার টাকায় বিদেশ গেছি, চাকরি করেছি। নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তোর জন্য কিছু করিনি।”
চাচা চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন।
“বাহ! এখন নিজের বাপের দোষ ধরলে? এত দিন কোথায় ছিলি?”
রাশেদ মাথা নিচু করল। প্রশ্নটার উত্তর তার জানা। কিন্তু মুখে বলতে গিয়ে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যেতে হলো।
“আমি তখনও ভুল করেছি। এখনো হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু আর চুপ থাকতে পারলাম না।”
মা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর হাতের আঁচলটা মুঠোয় পাকানো। তিনি একবার নীলার দিকে, একবার টেবিলে পড়ে থাকা চিঠিটার দিকে তাকালেন। তারপর রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
বৈঠক আর এগোল না। আত্মীয়রা চলে যাওয়ার সময় রাশেদের সঙ্গে কেউ কথা বললেন না। জমির দলিলগুলো টেবিলেই পড়ে রইল।
সন্ধ্যায় রাশেদ বোনকে ডাকল।
“আমার ওপর রাগ আছে?”
নীলা পুরোনো খামটা হাতে নিয়ে দাঁড়াল।
“রাগ করে কী হবে, ভাই? তুই তো জানতিস।”
রাশেদ উত্তর দিতে পারল না।
রাতে খাওয়ার সময় মা নীলার প্লেটে ভাত তুলে দিলেন। মাছের টুকরোটা দিতে গিয়ে হাত থামালেন, তারপর আস্তে করে প্লেটের এক পাশে রাখলেন।
নীলা খেতে বসে বলল, “কাল থেকে আমি আগের ঘরটায় ঘুমাব।”
মা শুধু বললেন, “আচ্ছা, মা।”
আর কিছু বললেন না। নীলাও কিছু জিজ্ঞেস করল না।
খাওয়া শেষে নীলা ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল। অনেক বছর পর নিজের জিনিসপত্রগুলো আবার গুছিয়ে রাখার কথা ভাবল।
রাশেদ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখল, বাবার ঘরের জানালায় আলো জ্বলছে। দেয়ালে ঝোলানো ছবিটা নামানো হয়নি।
পাশের ঘর থেকে নীলার কাশির শব্দ এল। মা উঠে এক গ্লাস পানি নিয়ে গেলেন।
রাশেদ দরজার কাছে এসে থামল। ভেতরে মা গ্লাসটা এগিয়ে দিচ্ছেন, নীলা পানি খাচ্ছে।
কেউ কথা বলছে না।
শুধু দরজাটা এবার বন্ধ হয়নি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।