নিশি উপাখ্যান সিরিজ
গল্প-১০
একাকীত্বের শান্তি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
যেদিন প্রথম মনে হলো, একা থাকলে বুকটা একটু কম ধড়ফড় করে, সেদিনই নিশি বুঝেছিল—সম্পর্কটা আসলে অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তবু চলে আসতে আরও কয়েক মাস লেগেছিল। প্রতিদিন নিজেকে বলত, আরেকটু দেখি। হয়তো এবার ঠিক হবে। হয়নি।
অভিক কখনো চিৎকার করত না। তবু সন্ধ্যায় বাসাটা যত কাছে আসত, নিশির বুকের ভেতরটা তত ভারী হয়ে উঠত। আজ আবার কী নিয়ে কথা হবে?
কোন কথাটা ভুল হবে?
কোন জায়গায় নিজেকে বুঝিয়ে বলতে হবে?
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে বাসটা হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেল। সবাই নেমে পড়ল। রাস্তার পাশের একটা চায়ের দোকানে বসে থাকতে হলো। এক কাপ চা। হালকা বাতাস। চারপাশে অচেনা মানুষ। অদ্ভুতভাবে সেদিন তার খুব শান্ত লাগছিল। কেউ কিছু জানতে চাইছে না। কাউকে কিছু বোঝাতেও হচ্ছে না।
বাসায় ঢুকতেই সেই শান্তিটা কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল—আমি কি বাড়ি ফিরতে চাই?
নাকি শুধু ফিরি, কারণ এটাই আমার বাড়ি?
উত্তরটা সেদিন পায়নি।
এরপরও সব চলেছে। একসঙ্গে খাওয়া। আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া। ছবি তুলে হাসা। বাইরে থেকে দেখলে কিছুই আলাদা ছিল না। একদিন রিমি বলল,
“তুই আগের চেয়ে অনেক চুপ হয়ে গেছিস।”
নিশি হেসে উড়িয়ে দিল। “বয়স হয়েছে।”
রিমি মাথা নাড়ল।
“না। মানুষ বয়সে চুপ হয় না। ক্লান্ত হলে হয়।”
কথাটা সেদিনও অস্বীকার করেছিল। কিন্তু রাতে ঘুম এল না।
তার কিছুদিন পর নিশি আলাদা হয়ে গেল। প্রথম রাতটা ছিল একদম ফাঁকা। একটা ছোট ভাড়া বাসা। একটা বিছানা। দুইটা ব্যাগ। আর অনেক নীরবতা। সে ভেবেছিল, খুব ভয় লাগবে। লাগল না।
জানালা খুলে বসে রইল। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছিল। সকালে ঘুম ভাঙল অ্যালার্ম ছাড়া। চা বানাতে গিয়ে চিনিটা একটু বেশি পড়ে গেল। এক চুমুক খেয়ে নিজেই হেসে ফেলল। কেউ বলল না,
“এতটুকু কাজও ঠিকমতো করতে পারো না?”
বিকেলে রিমি এল। ঘরটা দেখে জিজ্ঞেস করল,
“একা থাকতে কষ্ট হচ্ছে?”
নিশি একটু ভেবে বলল,
“একা লাগছে।”
তারপর মৃদু হেসে যোগ করল,
“কিন্তু অশান্ত লাগছে না।”
রিমি আর কিছু বলল না। ফেরার সময় দরজাটা টেনে দিল।
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। নিশি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। বৃষ্টিটা তখনও পড়ছিল। এবার আর নীরবতাকে ফাঁকা লাগল না। মনে হলো, অনেক দিন পর এই ঘরে অন্তত নিজের শ্বাসের শব্দটা ঠিকমতো শোনা যাচ্ছে।
আপনার মতে, ভুল মানুষের সঙ্গে থেকে প্রতিদিন অশান্তিতে থাকা ভালো, নাকি একা থেকে শান্তিতে বাঁচা?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।