মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরনঃ বিশ্লেষণধর্মী
তারিখঃ ৯ নভেম্বর ২০২৫
প্রবাস—অনেকের জন্য স্বপ্নের মতো শোনালেও, তার ভেতরে আছে এক গভীর নিঃসঙ্গতা।
হ্যাঁ, টাকার অভাব নেই, নিরাপত্তাও বেশ ভালো, নাগরিক সুবিধা হাতের মুঠোয়—তবু সম্পর্কের দিক থেকে প্রবাসী জীবনটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেছে। বিশেষ করে বিয়ের সম্পর্ক—এখন সেটা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য মাথাব্যথার বড় কারণ।
বাংলাদেশে একসময় বিয়ে মানেই ছিল আত্মীয়তা, পারিবারিক আলোচনা, নানারকম উৎসব। প্রবাসে এসে সেই চিত্রটা পাল্টে গেছে।
বাবা-মা চায় সন্তান যেন বাংলাদেশের বা মুসলিম সংস্কৃতির কাউকে বিয়ে করে, অথচ সন্তানরা বড় হচ্ছে এমন এক পরিবেশে, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা আর ভালোবাসা মানে একেবারে অন্যকিছু। এই দুই ভাবনার টানাপোড়েন থেকে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য দেয়াল—বাবা-মা ও সন্তানের মাঝে বাড়ছে দূরত্ব।
বিদেশে জন্মানো বা বড় হওয়া ছেলেমেয়েরা পড়ে যায় দোটানায়। ওরা চায় এমন জীবনসঙ্গী, যে বুঝবে তাদের প্রবাসী বাস্তবতা, দেবে স্বাধীনতার জায়গা।
কিন্তু পরিবার চায়, “দেশীয় মানসিকতার” পাত্র-পাত্রী। এই টানাপোড়েনে কেউ বিয়ে পিছিয়ে দেয়, কেউ সম্পর্কেই জড়ায় না, কেউ আবার নিঃসঙ্গতায় ডুবে যায়।
বিয়ের বাজারেও জটিলতা। আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন বা মধ্যপ্রাচ্যে—অনেকে মনের মতো জীবনসঙ্গী খুঁজে পায় না। বাংলাদেশের পরিবারগুলোও সন্দিহান—“ওরা তো বদলে গেছে, আমাদের সংস্কৃতি বোঝে না”—এমন ধারণা সম্পর্কের ফাঁক আরও বাড়ায়।
এর ফল খুব স্পষ্ট—প্রবাসী সমাজে একাকিত্ব বাড়ছে, যারা বিয়ে করছে, তাদের অনেকেই মানসিক দূরত্বে ভুগছে।
অনেকে বাধ্য হয়ে “সমঝোতার বিয়ে” করতে হয়—ভালোবাসা নেই, আছে শুধু পারিবারিক চাপ বা সামাজিক সম্মানের হিসাব। কিন্তু এসব সম্পর্ক বেশিক্ষণ টেকে না।
প্রবাসে মানসিক সমর্থন আর বোঝাপড়া ছাড়া সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব। এক সময় ক্লান্তি এসে সব শেষ করে দেয়—ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়, সম্পর্কটা শুধু টিকে থাকে কাগজে-কলমে।
সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার, এই সংকট শুধু প্রজন্মের নয়—এটা আসলে পরিচয়ের সংকট। নতুন প্রজন্ম জানে না, তারা কারা—পশ্চিমা সংস্কৃতির মানুষ, নাকি বাংলাদেশের শিকড়ে বাঁধা কেউ? এই দ্বিধা ওদের মধ্যে জন্ম দেয় বিভ্রান্তি, মানসিক চাপ, এমনকি সম্পর্কের ভয়। ওরা ভালোবাসে, কিন্তু বিয়েতে আস্থা হারিয়ে ফেলে।
এখন দরকার একটু সাহসী পরিবর্তন। বাবা-মা’দের বুঝতে হবে—সময় বদলেছে, সম্পর্কের ধরনও বদলেছে। উপদেশ নয়, দরকার বোঝাপড়া। সন্তানের ভালোবাসার পথে শাসন নয়, দরকার বিশ্বাস।
আর তরুণদেরও মনে রাখতে হবে—বিয়ে শুধু ভালোবাসা নয়, এটা ঐতিহ্যের দায়িত্ব। শুধু চুক্তি নয়, এটা হৃদয়ের সংলাপ।
প্রবাসে পরিবার ভেঙে গেলে, পরের প্রজন্ম হারায় শিকড়। শিকড় ছাড়া কোনো সংস্কৃতি টেকে না, পরিচয়ও হারিয়ে যায়।
তাই এই সংকট কেবল কিছু বিফল সম্পর্কের গল্প নয়—এটা এক জাতির আত্মপরিচয় হারানোর ইঙ্গিত।
এখন সময় এসেছে ভাবার—আমরা কি আমাদের সন্তানদের শেখাচ্ছি ভালোবাসা আর দায়িত্বের যোগফল? নাকি শুধু নিঃসঙ্গ স্বাধীনতার মোহে ডুবিয়ে দিচ্ছি?
নিজের শিকড় হারালে সমাজের ভবিষ্যৎ থাকে না। এখনই দরকার প্রবাসে সম্পর্ক, সংস্কৃতি আর মানবিক বন্ধনের নতুন করে শুরু—যেখানে বিয়ে শুধু দুইজন মানুষের নয়, দুই প্রজন্মেরও সেতুবন্ধন।
#প্রবাসজীবন #বিবাহসংকট #বাংলাদেশিসন্তান #সংস্কৃতিচেতনা #পরিচয়েরসংগ্রাম #মানবিকবন্ধন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।