শক্ত থাকার ভুল শিক্ষা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সন্তানকে সবসময় শক্ত বাবা-মা দেখালে সে শক্ত হতে শেখে না; বরং দুর্বলতাকে লুকাতে শেখে।
ছোটবেলায় সন্তান ভাবে, বাবা-মায়ের ভয় বলে কিছু নেই।
বাবা অসুস্থ হলেও বলেন, “কিছু হয়নি।”
সংসারে টাকার টান থাকলেও সন্তানকে বলেন, “সব ঠিক আছে।”
কোনো দুঃসংবাদ এলে মুখ শক্ত করে থাকেন। রাতে একা ঘরে গিয়ে হয়তো কাঁদেন, কিন্তু সন্তানের সামনে চোখের পানি মুছে ফেলেন।
মা সারাদিন সংসারের কাজ সামলে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। কখনো কোনো কারণে ভেঙে পড়তে ইচ্ছে করে। তবু সন্তানের সামনে হাসিমুখে থাকেন।
উদ্দেশ্যটা ভালো।
সন্তানকে দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখা। তাকে নিরাপদ রাখা। তার ছোট্ট পৃথিবীটাকে অযথা ভারী না করা।
কিন্তু এই আড়াল করতে করতে কখনো কখনো বাবা-মা একটা ভুল শিক্ষা দিয়ে ফেলেন।
সন্তান ভাবতে শুরু করে—কাঁদা যাবে না। ভয় পাওয়া যাবে না। কষ্টের কথা কাউকে বলা যাবে না।
কারণ তার দেখা বাবা কখনো ভয় পান না।
তার দেখা মা কখনো ভেঙে পড়েন না।
তারপর একদিন শিশুটির নিজের ভয় হয়।
পরীক্ষার ফল খারাপ হয়েছে। বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। কোনো প্রতিযোগিতায় হেরে গেছে। বড় হয়ে চাকরি হারিয়েছে। ভালোবাসার মানুষ তাকে ছেড়ে গেছে।
কিন্তু সে কারও কাছে গিয়ে বলতে পারে না, “আমার খুব ভয় করছে।”
সে কাঁদতে চায়, কিন্তু কাঁদে না।
কাউকে বলতে চায়, “আমি পারছি না।”
কিন্তু মুখে আসে, “কিছু হয়নি।”
কারণ ছোটবেলা থেকেই সে শিখেছে—কষ্ট দেখানো মানে দুর্বল হয়ে যাওয়া।
এখানেই একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে।
আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা আর আবেগ লুকিয়ে রাখা এক জিনিস নয়।
নিজের ভয়কে বুঝতে পারা শক্তি।
কিন্তু ভয় পেয়েও এমন ভান করা যে ভয়ই লাগেনি, সেটা শক্তি নয়।
কাঁদতে কাঁদতে নিজেকে সামলে নেওয়া শক্তি।
কিন্তু কাঁদতে ইচ্ছে করলেও চোখের পানি আটকে রেখে বলা, “আমি ঠিক আছি”—সবসময় শক্ত হওয়ার প্রমাণ নয়।
একজন বাবা যদি কোনো কঠিন সময়ে সন্তানের সামনে বলেন,
“আমি একটু চিন্তায় আছি। তবে আমরা বসে দেখব কী করা যায়।”
তাতে সন্তান নিরাপত্তা হারায় না।
বরং সে শেখে—চিন্তা করা যায়, ভয় পাওয়া যায়, তারপরও সমস্যার সামনে দাঁড়ানো যায়।
মা যদি কোনোদিন ক্লান্ত হয়ে বলেন,
“আজ আমার শরীর-মন দুটোই খুব ক্লান্ত। একটু বিশ্রাম নিলে ভালো লাগবে।”
সন্তান তখন শেখে, ক্লান্ত হওয়া অপরাধ নয়।
নিজের প্রয়োজনের কথাও বলা যায়।
কখনো বাবা যদি সন্তানের সামনে নিজের চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন,
“আজ আমার একটু কষ্ট হচ্ছে।”
সন্তান হয়তো প্রথমে অবাক হবে।
কারণ সে বাবাকে এমন দেখেনি।
কিন্তু সেই দৃশ্যটা তার মনে থেকে যাবে।
সে বুঝবে, বাবা কাঁদছেন বলে বাবা ছোট হয়ে যাননি।
বরং বাবা নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার না করেও দাঁড়িয়ে আছেন।
এই শিক্ষা খুব দরকার।
কারণ বড় হওয়ার পর জীবনের অনেক কষ্ট একা সামলানো যায় না।
কখনো বন্ধুর দরকার হয়।
কখনো জীবনসঙ্গীর।
কখনো পরিবারের কারও।
কখনো শুধু এমন একজন মানুষের, যার সামনে বসে বলা যায়, “আমি ভালো নেই।”
যে সন্তান ছোটবেলায় নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে শেখেনি, তার কাছে এই কথাটাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সে সাহায্য চাওয়ার বদলে চুপ করে থাকবে।
ভেঙে পড়ার পরও বলবে, “আমি সামলে নিতে পারব।”
কেউ কাছে এলে বলবে, “আমার কিছু হয়নি।”
তারপর একসময় তার চারপাশের মানুষ বুঝতেই পারবে না, ভেতরে ভেতরে সে কতটা ক্লান্ত।
বাবা-মা সন্তানকে সব দুশ্চিন্তার ভার দিয়ে দেবেন—এটা অবশ্যই প্রয়োজন নেই।
প্রাপ্তবয়স্কের সব সমস্যা শিশুর সামনে খুলে বসাও ঠিক নয়।
কিন্তু তাকে এমন একটা পৃথিবীর ধারণা দেওয়াও ঠিক নয়, যেখানে বাবা-মা কখনো ভয় পান না, কাঁদেন না, ভুল করেন না, ক্লান্ত হন না।
কারণ একদিন সেই সন্তানও বড় হবে।
তারও ভয় হবে।
তারও এমন রাত আসবে, যখন ঘুম আসবে না।
তারও এমন দিন আসবে, যখন কাউকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে ইচ্ছে করবে।
সেদিন সে যদি নিজের অনুভূতিকে লজ্জার বিষয় মনে করে, তাহলে ছোটবেলায় শেখা সেই নীরবতাই তাকে আটকে রাখবে।
তাই সন্তানের সামনে সবসময় নিজের শক্ত মুখটা দেখানোর প্রয়োজন নেই।
কখনো তাকে আপনার ক্লান্তি দেখতে দিন।
আপনার দুশ্চিন্তা বুঝতে দিন।
প্রয়োজনে চোখের পানিটাও দেখতে দিন।
তবে তাকে ভয় দেখাবেন না; বরং দেখান, ভয় পেয়েও কীভাবে স্থির থাকা যায়।
কষ্ট লুকিয়ে নয়, কষ্টকে বুঝে নিয়ে কীভাবে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।
কারণ সন্তান শুধু বাবা-মায়ের কাছ থেকে কীভাবে শক্ত হতে হয়, তা শেখে না।
সে তাঁদের দেখেই শেখে—কষ্ট পেলেও মানুষ ভেঙে না পড়ে কীভাবে নিজের ভেতরটা সামলে রাখতে পারে।
আর হয়তো কোনো একদিন, নিজের জীবনের কঠিন সময়ে সে লুকিয়ে না গিয়ে কাউকে বলবে—
“আমি শক্ত থাকার চেষ্টা করছি, কিন্তু আজ আমার একটু সাহায্য দরকার।”
সেদিন বুঝবেন, তাকে দুর্বল হতে শেখাননি।
আপনি তাকে মানুষ হতে শিখিয়েছেন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।